Video of Implantation of Human Embryo / জরায়ুতে ভ্রূণের প্রতিস্থাপনের ভিডিও
মাতৃজঠরে মানবজীবনের সূচনা হয় এক বিস্ময়কর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। শুক্রাণু এবং ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়ে তৈরি হয় ভ্রূণ। তারপর সেটি কয়েক দিনের মধ্যে মায়ের জরায়ুর ভেতরে গিয়ে বসে যায়। এই বসে যাওয়াকে বলা হয় প্রতিস্থাপন। এখান থেকেই শুরু হয় মানবভ্রূণের বৃদ্ধি, কোষ বিভাজন, এবং ধীরে ধীরে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা কেবল অনুমান আর কিছু ছবির সাহায্যে আশ্চর্য এই প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করতেন। কিন্তু তাঁদের কাছে এই প্রক্রিয়া সচক্ষে দেখার জন্য কোন উপায় ছিল না। তবে সম্প্রতি স্পেনের বার্সেলোনার ইনস্টিটিউট ফর বায়োইঞ্জিনিয়ারিং অব কাতালোনিয়ার (আইবিইসি) বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো মানুষের ভ্রূণকে মাতৃজঠরে জরায়ুর পরিবেশে প্রতিস্থাপিত হওয়ার সরাসরি ভিডিও রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছেন। আর এতেই দেখা গেছে সৃষ্টির লগ্নে অদ্ভুত এক চমৎকার। গত শুক্রবার সায়েন্স এডভান্সেস জার্নালে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।
এই সাফল্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাছে বিরাট এক অগ্রগতি। কারণ অনেক সময় বন্ধ্যাত্ব বা গর্ভপাতের মূল কারণ হয়ে ওঠে সঠিক ভাবে ভ্রূণের প্রতিস্থাপনে ব্যর্থ হওয়া। খতিয়ান বলছে, গর্ভপাতের অন্তত ষাট শতাংশই ঘটে এই কারণে। এতদিন পর্যন্ত ডাক্তাররাও এই ব্যর্থতার সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারতেন না। প্রতিস্থাপনের পুরো প্রক্রিয়াটি চোখের সামনে ধরা না পড়ায় বিষয়টি ছিল অনেকটাই অন্ধকারে। এই আবিষ্কারে এবার সেই পর্দা অনেকটাই সরে গেল।
আইবিইসি-র গবেষকরা ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের জন্য একটি অভিনব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। গর্ভাবস্থায় ভ্রূণ যখন মাতৃদেহের জরায়ুর মধ্যে বেড়ে ওঠে, তখন তা ‘অ্যামনিওটিক স্যাক’ নামের একটি বিশেষ থলির মধ্যে সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে। এই থলিকে বলা হয় ‘জীবন থলি’ বা ‘লাইফ স্যাক’। এই ‘জীবন থলির’ মধ্যে থাকা ‘অ্যামনিওটিক ফ্লুইড’ বা তরলই মানবভ্রূণের ক্রমবিকাশে সহায়তা করে। আইবিইসি-র গবেষকরা ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের জন্য এমনই একটি থলি তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন। তারা মায়ের শরীরে জরায়ুর টিস্যুতে থাকা নানান ধরনের প্রোটিন, বিশেষ করে কোলাজেন ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের জেল বানিয়েছেন। এবার সেই কোলাজেন জেল দিয়েই তারা তৈরি করেছেন কৃত্রিম ‘জীবন থলি’।
আরও পড়ুন – Darjeeling: শেলপু পাহাড়ের কোলেই আছে অহলদারা ভিউ পয়েন্ট, পুজোয় দার্জিলিং গেলে এই জায়গা মিস নয়
আইবিইসি-এর গবেষক দলের প্রধান স্যামুয়েল ওজোসনেগ্রোস জানাচ্ছেন, আইভিএফ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়া এক
দম্পতির দান করা ভ্রূণ এরপর ওই জেলের ভিতরে ফেলে দেওয়া হয়। তারপর আধুনিক মাইক্রোস্কোপ এবং ফ্লুরোসেন্স ইমেজিং কৌশল ব্যবহার করে তারা এই ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের প্রতিটি ধাপ টাইম ল্যপস কায়দায় রেকর্ড করতে সমর্থ হয়েছেন। যা এতদিন পর্যন্ত প্রায় অসম্ভব ছিল। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ভ্রূণটি প্রথমে কিছু এনজাইম নিঃসরণ করে জরায়ুর টিস্যুকে নরম করে ধীরে ধীরে নিজের জন্য পথ বানিয়ে নিচ্ছে। মাতৃগর্ভের ভেতরে ঢুকতে গিয়েই ভ্রূণটি তার চারপাশের টিস্যুর ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। গবেষক স্যামুয়েল ভ্রূণের এই স্বভাবকে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক বলে ব্যখ্যা করেছেন। ছোট্ট একটি ভ্রূণ থলির গায়ে নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে না থেকে নিজের পথ তৈরি করার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এক্ষেত্রে শুধু ভ্রূণের আচরণ নয়, জরায়ুর মধ্যেকার পরিবেশও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। মানুষের জরায়ু নিজে থেকেই মিনিটে গড়ে এক থেকে দুবার সংকুচিত হয়। মাসিক চক্রের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এই সংকোচনের ধরন বদলায়। গবেষকরা মনে করছেন, এই সংকোচনের মাত্রা ভ্রূণের প্রতিস্থাপনের সফলতা বা ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। জরায়ুর নড়াচড়া খুব বেশি হলে, ভ্রূণ যেমন ঠিকমতো প্রতিস্থাপিত হতে পারে না, তেমনি নড়াচড়া একেবারেই না হলে তাতেও ব্যর্থতা ঘটতে পারে। তাই ‘না বেশি না কম’ এরকম একটি ‘আদর্শ’ পরিস্থিতি ভ্রূণের ‘সফল’ প্রতিস্থাপনের জন্য উপযোগী হতে পারে।
ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের এই রহস্যই এতদিন বিজ্ঞানীদের কাছে অস্পষ্ট ছিল। সাম্প্রতিক গবেষণার এই ‘ভিডিও রেকর্ডিং’ সেই অন্ধকারকে অনেকখানি সরিয়ে দিল। আগামীদিনের চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই আবিষ্কার যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে তা বলাই বাহুল্য। বিজ্ঞানীদের আশা, এর ফলে ভবিষ্যতে গর্ভপাতের ঘটনা অনেকটাই আটকানো সম্ভব হতে পারে। তবে, তার আগে এবিষয়ে যে আরও পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন, তারও ইঙ্গিত দিয়েছেন গবেষকরা।
তথ্যসূত্র- লাইভ সায়েন্স
দাবিত্যাগ- এই নিবন্ধটি কেবলমাত্র তথ্যের উদ্দেশ্যে এবং কোনো চিকিৎসার জন্য পরামর্শ দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।