পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রহস্য: পুরীর জগন্নাথ মন্দির চারধামের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি ধাম। ৮০০ বছরের পুরানো এই মন্দির নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। ইতিহাস বলছে, পুরীর পুরোনো বা আদি জগন্নাথ মন্দিরটি রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দশম শতাব্দীতে রাজা অনন্তবর্মন এই মন্দিরটি নির্মান করেছিলেন। এই মন্দিরে এমন অনেক বিগ্রহ আছে যা মন্দিরের নির্মাণকালের থেকেও পুরোনো। প্রতিনিয়ত এই মন্দিরে এমন কিছু ঘটে, যার ব্যাখ্যা যুক্তি আর বিজ্ঞান দিয়ে করা খুব মুশকিল।
পুরীর প্রধান আরাধ্য দেবতা হলেন জগন্নাথদেব। তিনি পদে পদে তাঁর উপস্থিতি প্রমান করে চলেছেন আজও। মন্দিরে জগন্নাথ- বলরাম- শুভদ্রা স্বমহিমায় বিরাজমান। কথিত আছে, স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর জগন্নাথ অবতারে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। সারা বছর বহু পর্যটক এবং পুণ্যার্থীরা পুরীর জগন্নাথ মন্দির দর্শন করতে আসেন। বলা হয়, এই মন্দির দর্শন করলে নাকি সব মনস্কামনা পূর্ণ হয়। বিশেষ করে আষাঢ়ের শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে রথযাত্রার সময় এখানে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। রথের রশিতে টান দিতে শ্রীক্ষেত্র জগন্নাথধাম পরিণত হয় মহাসমারোহে।
পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রহস্য
পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের একেবারে চূড়ায় একটি পতাকা লাগানো থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হল এই পতাকা অবিশ্বাস্যভাবে সবসময় হাওয়ার বিপরীতেই ওড়ে। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া দুষ্কর। মন্দিরের প্রাচীনতম নিয়ম অনুসারে এই ধ্বজাটি প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বদলানো হয়। তাই প্রতিদিনই কোনো না কোনো একজন ব্যক্তি মন্দিরের শীর্ষে ওঠেন পতাকাটি পরিবর্তন করার জন্য। তবে বিনা প্রতিরক্ষায় এত উপরে পতাকা পরিবর্তন করতে উঠলেও আজ অবধি কারোর কোনো ক্ষতি হয়নি। কথিত আছে, এই পতাকা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া যদি একদিনের জন্যেও পালন না করা হয়, তাহলে মন্দিরটি আগামী ১৮ বছরের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।
পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের উপর দিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো পাখি বা বিমান উড়তে দেখা যায়নি। মন্দিরটি প্রায় ৮০০ বছরের পুরোনো। কিন্তু এত বছরেও কখনো মন্দিরের উপর দিয়ে পাখি বা বিমান উড়ে যায়নি। এমনকি আশ্চর্যের বিষয়, মন্দিরের চূড়ায় কখনো কোনো পাখিকে বসতে পর্যন্ত দেখা যায়নি।

শ্রীক্ষেএ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের একদম শীর্ষে আছে একটি নীল সুদর্শন চক্র। চক্রটি আকারেও বিশাল। তবে এই চক্রের একটি অদ্ভুত রহস্য হল, মন্দিরের যে প্রান্ত থেকেই দর্শন করা হোক না কেন, মনে হয় চক্রটি যেন তাঁর দিকেই মুখ করে তাকিয়ে আছে।
যে কোন বস্তুর ওপর আলো পড়লে ছায়া তৈরি হবে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু পুরীর জগন্নাথ মন্দির তার ব্যতিক্রম। মন্দিরটি প্রায় ৪ লক্ষ বর্গফুট এলাকা নিয়ে অবস্থিত। মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ২১৪ ফুট। তা সত্বেও এই মন্দিরের কোনো ছায়া পড়তে দেখা যায় না। সাধারণ বিজ্ঞানে এর ব্যাখ্যা পাওয়া সত্যিই মুশকিল।
লোককথা অনুযায়ী, জগন্নাথ মন্দিরের রান্নাঘর হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রান্নাঘর। এই রান্নাঘরে জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ তৈরীর প্রক্রিয়াও অদ্ভুত। মাটির উনুনে কাঠের আঁচে রান্না করা হয়। উনুনের উপর একটার উপর আর একটা, এরকম পরপর ৭টি পাত্র বসিয়ে ভোগ তৈরি করা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, সবথেকে উপরের পাত্রের রান্না সবার আগে সেদ্ধ হয়ে যায়। এমন করেই উপর থেকে পরপর পাত্র গুলির রান্না একেএকে তৈরি হয়। উনুনের ঠিক উপরে বসানো পাত্রের রান্না সম্পন্ন হয় সবার শেষে। এছাড়া, মন্দিরে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর ভিড় হলেও আজ অবধি প্রসাদে কখনও টান পড়ে নি, এমনকি প্রসাদ নষ্টও হয় নি। সত্যিই আশ্চর্যের বিষয়।
আরও পড়ুন –
রথের আগেই বড় ‘অঘটন’! পুরীর জগন্নাথ মন্দির থেকে ‘চুরি’ গেল দশমূল মোদক
যে কোনো সমুদ্র উপকূলে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ অনেক দুর থেকে শোনা যায়। পুরীর জগন্নাথ মন্দির সমুদ্রতটে অবস্থিত হওয়ায় বহু দূর পর্যন্ত সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়। তবে, আশ্চর্যের বিষয় মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করা মাত্রই সমুদ্রের ঢেউয়ের আর কোনো শব্দই পাওয়া যায় না। শোনা যায়, শ্রীকৃষ্ণের ছোট বোন সুভদ্রা চেয়েছিলেন মন্দিরের ভেতরটা যেন শান্ত আর নীরব থাকে। তাই মন্দিরের ভেতরটা এত নীরব থাকে।
প্রতি ৮, ১২ এবং ১৯ বছর অন্তর পুরীর মন্দিরের বিগ্রহ বদল করা হয়। অর্থাৎ এত বছর ছাড়া ছাড়া মন্দিরে স্থিত জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রার নতুন কলেবর দান করা হয়। আর এই নবকলেবরের জন্য ব্যবহার করা হয় নিমগাছের কাঠ। তার জন্য একটি গাছকে নির্ধারণ করা হয় এবং মন্দির কর্তৃপক্ষ একজন কাঠুরেকে এই কাজে নিযুক্ত করেন। এই কাঠুরে ২১ দিন ধরে সেই নিম গাছের কাঠ কাটেন, এবং সম্পূর্ণ গোপনে, যা কেউ জানতেও পারে না।
জগন্নাথদেবের বিগ্রহ যখন নবকলেবরের পর বদলানো হয়, তখন মন্দিরের পুরোহিতের চোখ বেঁধে দেওয়া হয়। প্রবীণ পুরোহিতই মূর্তি পরিবর্তন করেন। এই দৃশ্য কেউ দেখতে পারে না। শোনা যায়, এই দৃশ্য কেউ ভুলবশত যদি দেখে ফেলে তবে তাঁর চরম ক্ষতি হয়। এমনকি, এই বিগ্রহ বদলানোর সময় সমগ্র শহরের বিদ্যুৎ সংযোগও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।