Evolutionary Origin of Potatoes
সারা বিশ্বের খাদ্য তালিকায় আলু সিংহভাগ স্থান অধিকার করে আছে। রান্না করা খাবার থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবার যেমন চিপস- সব জায়গাতেই রয়েছে আলুর ব্যবহার। মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আলু। তবে এই আলুর জন্ম কিভাবে হল সেই নিয়ে এতদিন ধোঁয়াশা ছিল। অবশেষে বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় সেই অজানাকে জানা সম্ভব হল। জানা গেল আলুর জন্মের সঙ্গে নাকি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে টম্যাটোর।
আলু বর্তমান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ফসল। আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্দিস পর্বতমালার পাদদেশে প্রথম আলুচাষ হয়েছিল। আধুনিক পেরু এবং উত্তর-পশ্চিম বলিভিয়া অঞ্চলের ইনকারা প্রথম আলু চাষ করেছিল। ষোড়শ শতাব্দীর সময় থেকে আলু চাষ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তবে, এত দীর্ঘ দিনের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আধুনিক আলুর বিবর্তন কিভাবে হয়েছে তা এতদিন অজানাই ছিল। কিন্তু, সম্প্রতি চাষ করা আলুর ৪৫০টি এবং বন্য আলুর ৫৬টি প্রজাতি বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছেন, দক্ষিণ আমেরিকায় প্রায় ৯০ লক্ষ বছর আগে বন্য টম্যাটো এবং আলুর কাছাকাছি একটি প্রজাতির আন্তঃপ্রজননের ফলে আধুনিক চাষযোগ্য আলুর সৃষ্টি হয়েছিল।
আরও পড়ুন – ‘Megaflash’ Lightning Bolt: ৮২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বজ্রপাতের নয়া বিশ্বরেকর্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে
বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান আলুর জন্মের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে দুটি ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের সংকরায়ন। এই সংকরায়নের ফলেই এমন একটি নতুন উদ্ভিদের জন্ম হয়েছিল যারা মাটির নিচে একটি বিশেষ অংশ তৈরি করতে সক্ষম। যাকে বলা হয় আলুর কন্দ বা টিউবার। কন্দ হল আসলে গাছের একটি ফোলা অংশ, যেখানে খাদ্য এবং পুষ্টিগুণ উভয়ই সঞ্চিত থাকে। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এই কন্দ গঠনের জন্য দায়ী দুটি বিশেষ জিনকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। আর এখানেই ধরা পড়েছে আলু এবং টমেটো গাছের মধ্যে মূল পার্থক্য। দেখা যাচ্ছে, যেখানে টমেটোর মূল ভোজ্য অংশ হল তার ফল, আলুর ক্ষেত্রে তা হল মাটির নিচের কন্দ বা টিউবার।
আধুনিক যুগে আমরা যে আলু খাই, তার বিজ্ঞানসম্মত নাম হল ‘সোলানাম টিউবারোসাম’। গবেষণায় জানা গেছে, এই আলু আসলে দুটি ভিন্ন ধরনের উদ্ভিদের মিলিত রূপ বা সংকর জাত। আধুনিক আলুর ‘মাতা-পিতা’ সব্জির মধ্যে একটি হল পেরুর একটি প্রাচীন সব্জি- এটিউবারোসাম এবং অন্যটি টম্যাটো। এই দুটি উদ্ভিদই ‘সোলানাম’ গণভুক্ত এবং ‘নাইটশেড’ পরিবারের অন্তর্গত। এদেরই উত্তরসূরী হল আধুনিক আলু। তবে মজার বিষয়, এটিউবারোসাম নামের সব্জি গাছটি দেখতে অনেকটা আলু গাছের মতো হলেও মাটির নিচে এদের কন্দ ছিল না। তাহলে কিভাবে তৈরি হল আধুনিক আলু? বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে এটিউবারোসাম এবং টম্যাটোর জন্ম হয়েছিল একই পূর্বপুরুষ প্রজাতি থেকে। পরবর্তীকালে এরা পৃথক হয়ে দুটি ভিন্ন প্রজাতির রূপ নেয় এবং একে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর প্রাকৃতিক কারণে প্রায় ৫ লক্ষ বছর পর এদের মধ্যে ফের সংকরায়ন ঘটে এবং জন্ম নেয় আধুনিক প্রজাতির আলু।
আরও পড়ুন – What Happens After Death: ১ ঘণ্টার ‘সাময়িক মৃত্যু’, সেসময় নিজেই দেখলেন নিজের প্রাণহীন শরীরকে
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই সংকরায়নে টম্যাটো গাছ থেকে যে জিনটি এসেছিল সেটি হল ‘এস৬এ’, যা কিনা আলুর কন্দ তৈরিতে উৎসাহ প্রদান করেছিল। অন্যদিকে, এটিউবারোসাম থেকে এসেছিল মাটির নিচে আলুর টিউবার গঠন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দায়ী ‘আইটি১’ নামক একটি জিন। এই দুটি জিন একসাথে না মিলিত হলে আলু গাছের কন্দ কোনোদিনই তৈরি হত না। এটি ছিল একেবারে দুর্লভ এবং আকস্মিক একপ্রকার জিন-সংমিশ্রণ। বিজ্ঞানীরা সাধারণ আলু এবং বন্য আলুর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন আলুর প্রত্যেক প্রজাতির মধ্যে এটিউবারোসাম এবং টম্যাটো গাছের জিনের বলিরেখা রয়েছে। যা প্রমাণ করে, আলু জিনগত স্তরে টম্যাটোর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এই ঘটনা একেবারে বিরল। গবেষকদের মতে, আন্দিস পর্বতমালার ভূ-গাঠনিক প্রক্রিয়ার সময় সেখানকার ঠাণ্ডা, শুষ্ক এবং উচ্চভূমির পরিবর্তিত জলবায়ু পরিবেশে আলুর কন্দই ছিল টিকে থাকার মূল অস্ত্র। কন্দের পুষ্টি সঞ্চয় করা এবং বীজ ছাড়াই বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা আলুকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল সেই প্রতিকূল পরিবেশে।
আরও পড়ুন – কারোর কাছে এই শহর ‘বিশ্বের বিনোদন রাজধানী’, আবার কারোর কাছে ‘পাপের শহর’, এমনটা কেন?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আবিষ্কার কেবলমাত্র আলুর ইতিহাস জানার জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকরা বলছেন, এই জিনগত তথ্য কাজে লাগিয়ে আলুর রোগ এবং প্রতিকূল জলবায়ু সহ্য করতে পারে এমন নতুন আলু তৈরি করা সম্ভব। চাইনিজ় অ্যাকাডেমি অফ এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের জীববিজ্ঞানী সানওয়েন হুয়াং-এর মতে, টমেটোর কিছু জিন ব্যবহার করে আলুর ক্ষতিকর মিউটেশনগুলি এড়িয়ে আরও ভালো জাতের সংকর আলু তৈরি করা সম্ভব, যা প্রতিকূল পরিবেশ পরিস্থিতিতে ভালো ফলন দিতে পারে। বর্তমানে আমাদের খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত আলু মূলত কাটা কন্দ থেকে জন্মানো হয়। এই পদ্ধতিতে একই জাতের আলু জন্মানোর জন্য নতুন রোগ দেখা দিলে একসাথে অনেক ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু বীজ থেকে আলু তৈরি হলে বিভিন্ন জিনগত বৈচিত্র্য ধরা পড়ে, যা ভবিষ্যতের জন্য বেশি নিরাপদ। সারা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম খাদ্য-উৎস হিসেবে আলুর গুরুত্বকে মনে করে এই আবিষ্কার ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেবে, এমনটাই মনে করছেন গবেষকরা।
তথ্যসূত্র- সিএনএন, লাইভ সায়েন্স