Sunday, January 25

বিনোদন

সরস্বতী পুজো থাকুক, কিঞ্চিৎ হলেও, সাবেকি মতে, পরম্পরার ধাঁচে

বৈচিত্র্যের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে পুজোর ‘মূল সুর’। নীরবতা, সংযম এবং ছিমছাম পরিবেশের আবহ ভেঙে তৈরি হচ্ছে শব্দমুখর অবয়ব। এক সময় দেবীর কাছে প্রার্থনা মানেই ছিল ‘বিদ্যা দাও, বুদ্ধি দাও মা।’
সরস্বতী পুজো থাকুক, কিঞ্চিৎ হলেও, সাবেকি মতে, পরম্পরার ধাঁচে
দেবী সরস্বতী।িছবি- সংগৃহীত।

‘আটপৌরে’ সরস্বতী পুজো

বিগত কয়েক দশকে সমাজের চেহারা যেমন বদলেছে, তেমনি আমূল পরিবর্তন এসেছে আমাদের উৎসব-সংস্কৃতির ভাষাতেও। প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির সাথে স্মার্টফোনে বন্দি হয়েছে আমাদের পৃথিবী। সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে মানুষের একাকিত্ব। মানুষ যত বেশি ভার্চুয়াল দুনিয়ার গভীরে প্রবেশ করেছে, তত বেশি যেন দূরে সরে গেছে বাস্তব অনুভূতির জায়গাগুলি থেকে। এই বদলে যাওয়া জীবনধারার ছায়া পড়েছে আমাদের উৎসব সংস্কৃতির মধ্যেও।

যেমন সরস্বতী পুজোর কথাই ধরা যাক। একসময় সরস্বতী পুজো মানেই ছিল নীরব প্রস্তুতি। তা সে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই হোক বা স্কুলের চৌহদ্দির মধ্যে। শীতের আবহে সরস্বতী পুজোর সময় আসলে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত। দশকর্মার বাজার, প্রতিমা কেনা, পুরোহিত জোগাড় সবই চলত প্ল্যানমাফিক। বাড়ির বড়রা কিম্বা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা থাকতেন প্রস্তুতির নেপথ্যে। ছোটদের মধ্যে পুজোর শেষবেলার প্রস্তুতিতে থাকত খুনসুটি এবং দুষ্টুমি। ভোররাতে চাদর মুড়ি দিয়ে অন্যের গাঁদা ফুলের বাগানে ‘হানা’ দেওয়া হত। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঝুড়ি ভর্তি ফুল নিয়ে তারা ফিরত মণ্ডপে। বাগানের পর বাগান এভাবে রাতারাতি ফাঁকা হয়ে যেত। মণ্ডপ সাজানোতেও থাকত ছোট ছোট হাতের শৈল্পিক চিন্তাভাবনা। আলমারি থেকে মায়ের নতুন কাপড় লুকিয়ে বার করে ব্যবহার করা হত ‘তিন ফুটের’ প্যান্ডেলে। প্যাকাটি, সাদা সুতো, রংবাহারি পাতা দিয়ে সেজে উঠত মায়ের বেদি। সে এক অন্য সময় ছিল। হৈহৈ রইরই করে কেটে যেত সরস্বতী পুজোর কয়েকটা দিন।

আরো মজা হত পুজোর দিনে। সাদা-হলুদের আটপৌরে সাজ, নতুন খাতার গন্ধ, বইয়ের স্তূপের পাশে বসে থাকা শান্ত মুখের দেবীর হাতে প্যাড়া সন্দেশ গুঁজে দেওয়ার জন্য লাইন লেগে যেত। ছাত্রছাত্রীদের চোখেমুখে লেগে থাকত বিদ্যা, বুদ্ধি আর মায়ের কাছ থেকে এই বিশেষ দিনে আশীর্বাদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। পাড়ার ছোট ছোট মণ্ডপে কিম্বা বাড়ির কোণে গোছানো প্রতিমার সামনে মাথা নোয়ানো ছিল একান্ত ব্যক্তিগত প্রার্থনা।


সরস্বতী পুজো থাকুক, কিঞ্চিৎ হলেও, সাবেকি মতে, পরম্পরার ধাঁচে

দেবীর যজ্ঞ। ছবি- সংগৃহীত

 

আজকালকার যুগে সরস্বতী পুজোর সেই ছবিটা অনেকটাই বদলে গেছে। শহরের হাউজ়িং সোসাইটিগুলিতে সরস্বতী পুজো আজকালকার দিনে হয়ে উঠেছে এক ‘ইভেন্ট’। শারদোৎসবের মত প্যান্ডেল প্যান্ডেলে ভিড় করেছে থিমের জটিল চিন্তাভাবনা। নানান সংস্কৃতির মিশেলে তৈরি হচ্ছে ঝলমলে আয়োজন। ডিজে বক্স আর অগুনতি মাইকের গুমগুম শব্দে কেঁপে উঠছে এলাকা। সূর্য ডোবার সাথে রঙবেরঙের আলোর ছটায় ঢেকে যাচ্ছে দেবীর প্রতিকৃতি। কোথাও কোথাও আবার পুজোর শান্ত পরিবেশ ছাপিয়ে যাচ্ছে পার্টির আবহ। অযাচিত ভিড়, সেলফি, রিল বানানোর চক্করে দেবীই শেষমেষ ‘ব্রাত্য’ হয়ে উঠছে। ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠছে পুজোর নিরিবিলি মুহূর্তগুলো। বিশেষ করে শহুরে জীবনে হাউজ়িং সোসাইটির মিশ্র সংস্কৃতি পুজোর চরিত্রকেই বদলে দিচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্য ও পটভূমি থেকে আসা মানুষের মিলন স্বাভাবিকভাবেই উৎসবের রীতিতেও বৈচিত্র্য এনেছে। কিন্তু সেই বৈচিত্র্যের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে পুজোর ‘মূল সুর’। নীরবতা, সংযম এবং ছিমছাম পরিবেশের আবহ ভেঙে তৈরি হচ্ছে শব্দমুখর অবয়ব। ডিজে বক্সের উচ্চস্বরে গান যখন মন্ত্রোচ্চারণকে ঢেকে দেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে- এই পুজো কি আদৌ বিদ্যার আরাধনা, নাকি নিছকই আর পাঁচটার মত একটি সামাজিক অনুষ্ঠান?

প্রার্থনার ভাষাতেও এসেছে পরিবর্তন। এক সময় দেবীর কাছে প্রার্থনা মানেই ছিল ‘বিদ্যা দাও, বুদ্ধি দাও মা।’ নতুন দিস্তা খাতার পাতা উল্টে সকালবেলায় লিখতে হত ‘ওম সরস্বত্যই নমঃ’। এমনকি ফলমূল খাওয়াতেও ‘কঠিন রীতিরেওয়াজ’ ছিল। পুজোর আগে কুল না খাওয়ার ‘ব্রত পালন’ করতে হত ক্ষুদেদের। তবে এখন সেসবের পাঠ অনেকটাই চুকে গেছে। তার জায়গা আজ দখল করেছে পুজোর ফ্যাশন, দেবীকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে সেলফি তোলা, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা, রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাঞ্চ-ডিনার সারা, কোথাও কোথাও আবার ডিস্কোর তালে সন্ধ্যেবেলায় ‘শরীর ঝালিয়ে’ নেওয়া প্রভৃতি। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, বিদ্যার আরাধনায় এই পরিবর্তনের অর্থ কি ছিল?

অবশ্য এই পরিবর্তনকে পুরোপুরি অস্বীকার করারও উপায় নেই। সময়ের সঙ্গে সবকিছুরই বদল হয়। উৎসব কেন তার ব্যতিক্রম হবে? সমাজ যেমন বহুমুখী হয়েছে, তেমনই উৎসবের প্রকাশও বদলেছে। তবে জাঁকজমকের ভিড়ে আমরা যেন ভুলে না যাই আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে। সরস্বতী পুজো থাকুক কিঞ্চিৎ হলেও সাবেকি মতে, পরম্পরার ধাঁচে। ডিজে বাক্সের শব্দ কমিয়ে, হাতের মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে এক মুহূর্তের জন্য ফেরা যায় ছোটবেলাকার সময়ে। আজকালকার ছোট ছোট শিশুরা একবার হলেও দেখার সুযোগ পাক আমরা কেমন করে আনন্দ করেছি এমন দিনে।

 

আরও পড়ুন – দেব-শুভশ্রী জুটির সপ্তম ছবির টিকিট বুকিং শুরু, কবে মুক্তি পাচ্ছে ‘দেশু৭’?

আরও পড়ুন – ‘বিজয়নগরের হীরে’র সন্ধানে এবার কাকাবাবু, প্রকাশ্যে ট্রেলার

ফলো করুণ-