Wednesday, April 15

বিনোদন

আজ পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন, বছরের প্রথম দিনটি নিয়ে ইতিহাস কি বলছে?

১৯৬৫ সালে, বাংলাদেশে, ছায়ানটের উদ্যোগে রমনার বটমূলে ‘এসো হে বৈশাখ’ গান দিয়ে নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়, যা পরে বাঙালির জাতীয় চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে।
আজ পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন, বছরের প্রথম দিনটি নিয়ে ইতিহাস কি বলছে?
পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ, ১৪৩৩ সন। ছবি- উইকিমিডিয়া কমনস।

Bangla Noboborsho, Pohela Boishakh

আজ পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন।

বাঙালির পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন পোশাক, হালখাতা প্রথা, আর কব্জি ডুবিয়ে খাওয়াদাওয়া। বাঙালির ক্যালেন্ডার অনুসারে এই দিন নতুন বাংলা বর্ষের সূচনা করে। ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রথম দিন হালখাতা হিসেবে পালন করেন। দোকানে দোকানে লক্ষ্মী ও গণেশের পুজো এবং ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হয়। তাই বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে হালখাতার প্রথা। বাঙালির ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি বিশেষ অংশ হলো এই হালখাতা।

তবে শুধু হালখাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় পয়লা বৈশাখের তাৎপর্য। এর গভীরে লুকিয়ে আছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং জাতীয় চেতনার বিস্তৃত অধ্যায়। বাংলা নববর্ষের উৎপত্তি জানতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় মুঘল আমলে। সম্রাট আকবরের শাসনকালেই প্রথম এই নববর্ষের সূচনা ঘটে। তখন ভারতে হিজরি সন অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হতো, যা চন্দ্রবর্ষ নির্ভর হওয়ায় কৃষিকাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

চন্দ্রবর্ষ সৌরবর্ষের তুলনায় প্রায় ১০-১২ দিন ছোট হওয়ায় কৃষকদের পক্ষে ফসল তোলার সঠিক সময় অনুযায়ী খাজনা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সম্রাট আকবর তাঁর সভাসদ আবুল ফজল ও রাজা টোডরমলের পরামর্শে এবং রাজজ্যোতিষী আমীর ফতেউল্লাহ সিরাজীর হিসাব অনুযায়ী একটি নতুন বর্ষপঞ্জির প্রবর্তন করেন—যার নাম ‘ফসলি সন’।

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এই সনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলেও কার্যকর ধরা হয় ১৫৫৬ সাল থেকে, যেদিন আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই ‘ফসলি সন’ই পরবর্তীতে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে হিজরি ৯৬৩ সনের ১ মহররম এবং ১ বৈশাখ, ৯৬৩ একই দিনে শুরু হয়েছিল—যা চন্দ্র ও সৌরবর্ষের এক অনন্য সমন্বয়।

বাংলা নববর্ষ কেবল উৎসব নয়, এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। নববর্ষের ধারণা অবশ্য আরও প্রাচীন। মেসোপটেমিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালে প্রথম নববর্ষ উদযাপনের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে জুলিয়াস সিজারের সময় খ্রিস্টীয় নববর্ষ চালু হয়। ইরানের ‘নওরোজ’ উৎসবও মুঘলদের হাত ধরে ভারতে আসে এবং জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হতো। তবে বাংলা নববর্ষের বিশেষত্ব হলো—এটি অর্থনীতি, কৃষি এবং সংস্কৃতির একত্র মেলবন্ধন।

ব্রিটিশ আমলেও এই সনের গুরুত্ব বজায় ছিল। ১৮৬০ সালে ভারতের প্রথম বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী জেমস উইলসন বাংলা সনের সঙ্গে অর্থবছরের সামঞ্জস্য রাখার পক্ষে মত দেন। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বাংলা ক্যালেন্ডারে সংস্কার আনা হয়, যাতে লিপইয়ারের সমস্যা দূর হয়। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় হালখাতা। ‘হাল’ কথার অর্থ হল ‘নতুন’, ‘খাতা’ অর্থে হিসেবের বই। অর্থাৎ নতুন বছরের নতুন হিসেব। চৈত্র মাসের শেষে পুরোনো হিসেব মিটিয়ে বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন খাতায় হিসেব শুরু করার প্রথাই হলো হালখাতা।

মুঘল আমলে চৈত্রের শেষ দিনে প্রজারা খাজনা পরিশোধ করতেন এবং বৈশাখের প্রথম দিনে জমিদাররা তাঁদের মিষ্টি খাওয়াতেন। এই অর্থনৈতিক রীতিই ধীরে ধীরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে হালখাতা প্রথা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজও বাংলার ব্যবসায়ীরা নববর্ষের দিন দোকানে নতুন খাতা খোলেন। খাতা খোলার আগে সেটিকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে পুজো করানো হয়। খাতার প্রথম পাতায় সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকা হয়, যা মঙ্গল ও সমৃদ্ধির প্রতীক।

বিশেষ করে কালীঘাট মন্দিরে এই দিনে ব্যবসায়ীদের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে—এই প্রথা আজও কতটা জীবন্ত। দোকানে দোকানে ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, মিষ্টিমুখ করানো হয়—পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তোলার এক আন্তরিক প্রচেষ্টা।

বাংলা নববর্ষ ধীরে ধীরে তাই সর্বজনীন উৎসবের রূপ নিয়েছে। নববর্ষ আজ আর শুধু অর্থনৈতিক প্রথা নয়, এটি বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই দিনে একসাথে আনন্দে মেতে ওঠে। নাচ-গান, মেলা, পান্তা-ইলিশ—সব মিলিয়ে এক বর্ণিল আবহ তৈরি হয়।

১৯৬৫ সালে, বাংলাদেশে, ছায়ানটের উদ্যোগে রমনার বটমূলে ‘এসো হে বৈশাখ’ গান দিয়ে নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়, যা পরে বাঙালির জাতীয় চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি শাসনের বাধা উপেক্ষা করে এই উদযাপন এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে পহেলা বৈশাখকে জাতীয় পার্বণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা আজ নববর্ষের অন্যতম আকর্ষণ, ২০১৬ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিকতার প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

পয়লা বৈশাখ মানেই তাই নতুন শুরু। পুরোনো বছরের গ্লানি, ব্যর্থতা, কষ্ট ভুলে নববর্ষে নতুন স্বপ্ন দেখার দিন। হালখাতার নতুন পাতার মতোই জীবনকেও নতুন করে সাজানোর আহ্বান জানায় বাংলা নববর্ষ।

 

আরও পড়ুন – আশা ভোঁসলের শেষযাত্রায় কান্নায় ভেঙে পড়লেন জনাই ভোঁসলে, সিরাজের সান্ত্বনা দেওয়ার ভিডিও দেখে চোখে জল নেটিজেনদেরও

ফলো করুণ-