Monday, January 26

দেবীর মহিষাসুরমর্দিনী রূপের সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ জুড়ে গেল কিভাবে? এর তাৎপর্যই বা কি?

দেবীর মহিষাসুরমর্দিনী রূপের সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ জুড়ে গেল কিভাবে? এর তাৎপর্যই বা কি?
মহিষাসুরমর্দিনী রূপ। জগতের মা। গ্রাফিক- সিবুলেটিন ডট কম।

মহিষাসুরমর্দিনী | Mahishasuramardini

দুর্গারূপেই দেবী মহিষাসুরকে বধ করেন। অসুররাজ মহিষাসুর যখন দেবতাদের হারিয়ে স্বর্গরাজ্য দখল করল, তখন সমগ্র দেবতাদের মিলিত শক্তিপুঞ্জ থেকে সৃষ্টি হল দেবী দুর্গার। এরপর দেবতাদের অস্ত্র দ্বারা সুসজ্জিত হয়ে দেবী দুর্গা আশ্বিনের শুক্লা অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিকালে মহিষাসুরকে বধ করেন। এর ফলে উদ্ধার হয় স্বর্গরাজ্য, রক্ষা পায় দেবকূল। তাই তিনি পূজিত হন মহিষাসুরমর্দিনী রূপে।

দেবী দুর্গা তাঁর পরিবারকে সঙ্গে নিয়েই মর্ত্যে আসেন। সঙ্গে থাকে তাঁর দুই কন্যা আর দুই পুত্র সন্তান। দশপ্রহরণধারিণী মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার এই পরিবার শারদীয়া দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য।

ধ্যাণমন্ত্র

দেবী দুর্গার ধ্যাণমন্ত্রে উল্লেখ আছে – তিনি যটাজুট পরিহিতা, মাথায় অর্ধচন্দ্র এবং ত্রিনয়না। অতসী ফুলের মতো তার গায়ের রং। তিনি নবযৌবনসম্পন্না। ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিতে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন। দশ হাতে তাঁর দশটি অস্ত্র। পদতলে মস্তক-ছিন্ন মহিষ। আর সেই মহিষ থেকে বেরিয়ে আসা দানব বিদ্ধ হয়েছে দেবীর ত্রিশূলে। দেবীর ডান পা সিংহের পিঠে আর বাম পায়ের বুড়ো আঙ্গুল অসুরের কাঁধে। এই হল মৃন্ময়ী মায়ের রূপ। এখন, প্রশ্ন হচ্ছে, এই অসুরদলনী মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার সঙ্গে তাঁর দলবল লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক এবং গণেশ জুড়ে গেলেন কিভাবে?

লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ

শাস্ত্রকারদের মতে, দেবী দুর্গা কেবল মহিষাসুরমর্দিনী নন, তিনি হলেন ‘স্বর্গপ্রদায়িনী বেদি’ বা যজ্ঞকুণ্ডের প্রতীক। যজ্ঞ কেবলমাত্র একটি আচার নয়, বরং সমাজ জীবনের শক্তির বিভিন্ন রূপকে একত্রিত করার প্রয়াস। সেই যজ্ঞ সম্পূর্ণ করতে যে চারটি মৌলিক শক্তি প্রয়োজন, সেটাই প্রতীকীভাবে রূপায়িত হয়েছে দুর্গার চার সন্তান- লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের মাধ্যমে।

যজ্ঞকুন্ড বা বেদিকে ধরা হয় দেবীর আসন রূপে। আর দেবীর এই যজ্ঞ সম্পাদন করতে প্রয়োজন হয় চার দেব-দেবীকে। এই চারজনের মধ্যে একজন কুণ্ডকে বা বেদিকে রক্ষা করেন। তিনি হলেন দেবসেনাপতি কার্তিক। কুণ্ডে যজ্ঞ শুরু করেন একজন। তিনি সিদ্ধিদাতা গণেশ। আবার যজ্ঞ সাধন বা জ্ঞানের সম্পূর্ণতায় দেবী সরস্বতী অপরিহার্য। তিনি বেদজ্ঞানের আধার। যজ্ঞের জন্য জ্ঞান দান করেন। আর যজ্ঞ সম্পূর্ণ করার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন তার জন্য আছেন স্বয়ং লক্ষ্মী।

তবে এ সবই মূলত প্রতীকী। বৈদিক ব্যাখ্যায় দেবী সরস্বতী হলেন জ্ঞানশক্তি বা ব্রাহ্মণ্য শক্তির প্রতীক। অন্যদিকে দেবী লক্ষ্মী হলে অর্থ ও সম্পদের দাত্রী। দেবসেনাপতি কার্তিকেয় হলেন ক্ষত্রিয়শক্তির প্রতীক এবং গণেশ হলেন গণশক্তি বা শ্রমশক্তির প্রতীক। ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় দুর্গার পাশে থাকা এই চার দেব-দেবী আসলে সমাজের চারটি স্তম্ভের প্রতীক—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। দেবী দুর্গা যখন মর্ত্যে আসেন তখন এই চার শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। পুত্রকন্যা রূপ এই চার শক্তিকে নিয়েই পূর্ণতা পায় তাঁর প্রকৃত রূপ। তিনি জগতের মা দেবী দুর্গা।