দুর্গাপুজোয় দেবীর বোধন কেন হয়
শারদীয়া দুর্গোৎসবে দেবীর বোধন সর্বাধিক গুরুত্বপুর্ণ। মহাশক্তি দশভুজার পুজো শুরু হয় এই বোধনের মধ্য দিয়ে। দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আবাহন জানানো হয় এই বোধনের মাধ্যমেই। বাংলার সংস্কৃতিতে এই বোধনকে ঘিরেই দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন বোধন ছাড়া কেন দুর্গাপুজো শুরু হয় না? বোধনের অর্থই বা কি? কেনই বা করা হয় দেবীর বোধন?
বোধন
বোধন শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল ‘জাগরণ’ বা ঘুম থেকে জাগানো। অর্থাৎ বোধনের মাধ্যমে দেবীকে জাগিয়ে তোলা। তবে এখানে ‘জাগরণ’ প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত। কেননা, শাস্ত্রকারদের মতে মহাশক্তি দেবী দুর্গা কখনো নিদ্রিত হন না।
কল্পারম্ভ
বোধনের প্রকৃত অর্থ হল ‘কল্পারম্ভ’- অর্থাৎ পুজোর সূচনাকল্প। ‘কল্প’ শব্দের অর্থ হল ‘সংকল্প’। আর ‘আরম্ভ’ হল ‘শুরু’ বা সূত্রপাত। অর্থাৎ কল্পারম্ভের মাধ্যমে এক তিথি থেকে আরেক তিথি পর্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে পুজোর নিয়ম পালন করার সংকল্প নেওয়া হয়।
দেবীর বোধন হয় কেন?
শাস্ত্রমতে, দেবতাদের ছমাসে একদিন আর ছমাসে এক রাত। অর্থাৎ দেবতারা ছমাস জাগ্রত থাকেন এবং ছমাস ঘুমান। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত এই ছয় মাস হল উত্তরায়ণ এবং শ্রাবণ থেকে পৌষ পর্যন্ত ছয় মাস দক্ষিণায়ন। দেবতাদের উত্তরায়ণ হল একদিন এবং দক্ষিণায়ণ হল একরাত। আশ্বিন মাস দক্ষিণায়নের অন্তর্গত। অর্থাৎ শরৎকালে দেবতারা নিদ্রিত থাকেন। তাই ঘুম থেকে জাগানোর জন্য তাঁদের বোধনের প্রয়োজন হয়। এই কারণে শারদোৎসবে পুজো করার জন্য দেবীর বোধন করতে হয়। আর অসময়ে বোধন করা হয় বলে শারদীয়া দুর্গাপুজোকে অকালবোধন বলা হয়।
অকালবোধন
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, রামচন্দ্র যখন রাবণের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তিনি শরৎকালে দুর্গাপুজো করেছিলেন। শাস্ত্রমতে পুজোর কাল ছিল বসন্তকাল। কিন্তু রামচন্দ্র শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করেছিলেন। এই অপ্রচলিত সূচনা বা আকস্মিক আবাহনই অকালবোধন নামে পরিচিত হয়। কালক্রমে এই কাহিনি বাংলায় শরৎকালীন দুর্গোৎসবের ভিত্তি গড়ে তোলে। শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী, ষষ্ঠীর দিন দেবীকে আবাহন করার রীতি আজ শারদীয়া দুর্গোৎসবের অপরিহার্য অঙ্গ।
কৃষ্ণানবম্যাদি কল্প
শাস্ত্রমতে বোধন বা কল্পারম্ভের ভাগ রয়েছে। রঘুনন্দন স্মৃতিতে দুর্গোৎসবের ছয় রকম কল্পের কথা বলা হয়েছে। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে দেবীর বোধন হয়ে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথি পর্যন্ত ১৫ দিন দেবীর যে অর্চনা করা হয় তাকে কৃষ্ণানবম্যাদি কল্প বলা হয়।
প্রতিপদাদি কল্প
আবার আশ্বিন মাসের শুক্লা প্রতিপদে দেবীর বোধন হওয়ার পর শুক্লনবমী পর্যন্ত নয়দিনের পুজোকে বলে প্রতিপদাদি কল্প। বিশেষ করে বনেদী বাড়িতে বহুবছর ধরে চলে আসা দুর্গাপুজোয় বোধনের এই রীতি অনুসরণ করতে দেখা যায়।
ষষ্ঠ্যাদি কল্প
অন্যদিকে, বারোয়ারি পুজোয় এই ১৫ বা ৯ দিনের বোধন সম্ভব হয় না বলে সেখানে নিদান রয়েছে ষষ্ঠ্যাদি কল্পের। ষষ্ঠ্যাদি কল্পে চারদিনের পুজো হয়। এই কল্প অনুসারে ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যেবেলায় বিল্ববৃক্ষের শাখায় দেবীর বোধন করা হয়। পরে ঘটে হয় ওইদিনের পুজো। এরপর সপ্তমী থেকে মোট তিনদিন মৃন্ময়ী মায়ের প্রতিমায় পুজো করা হয়।
তথ্যসূত্র: দুর্গাপুজার দু-এক কথা- স্বামী দিব্যানন্দ




