Devi Durga Durgatinashini
যিনি দুর্গতি ও শঙ্কা হরণ করেন, তিনিই দেবী দুর্গা দুর্গতিনাশিনী। স্বয়ং চণ্ডীতে দেবী বলেছেন, ‘দুর্গম নামের এক ভয়ঙ্কর অসুরকে বধ করে আমি দেবী দুর্গা নামে পরিচিত হব’। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে দেবীকে ‘দুর্গে দুর্গতিনাশিনী’ নামে ডাকা হয়েছে। অর্থাৎ যাঁকে স্মরণ করলে মানবকুলের দুর্গতি নাশ হয় তিনি দুর্গতিনাশিনী নারায়ণী দেবী দুর্গা।
|| দেবী দুর্গা ||
দুর্গা নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দেবীর আসল পরিচয়। হিন্দু শাস্ত্রে তাঁকে কেবলমাত্র দেবী হিসেবেই বর্ণনা করা হয় নি, বরং তিনি মহাশক্তির বহিঃপ্রকাশ। অসুররা যখন দেবতাদের পরাভূত করে স্বর্গ দখল করে নেয়, তখন দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকেই জন্ম নেন মহাশক্তি দেবী দুর্গা। দেবতারা যেখানে ব্যর্থ, সেখানে একক শক্তিরূপী দুর্গা সকল সংকট মোচন করেন।
শাস্ত্রমতে, জগতের সৃষ্টিকর্তা হলেন ব্রহ্মা, পালনকর্তা বিষ্ণু এবং সংহারকর্তা মহেশ্বর। এই তিন শক্তি হল ব্রহ্মারই তিন রূপ। এক পরমব্রহ্মের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। তাঁদের শক্তিরই প্রকাশ এই দেবী দুর্গা। কিন্তু তিনি আলাদা সত্তা নন, তিনি ব্রহ্মশক্তির নারীপ্রকাশ। আদিশক্তি মহামায়ার অন্য রূপ। জগতকে তিনি রক্ষা করেন। মহিষাসুর, শুম্ভ-নিশুম্ভ, রক্তবীজ, অতিদুর্গম দুর্গদৈত্যের মত অসুরকে তিনি বিনাশ করে জগতের দুর্গতিনাশ করেছেন।
মহিষাসুর
পুরাণ অনুসারে, অসুর রাজা রম্ভাসুরের সঙ্গে এক মহিষের মিলন থেকে জন্ম নেয় ত্রিলোকজয়ী মহিষাসুর। ওই মহিষ আসলে ছিল শাপগ্রস্ত রাজকন্যা শ্যামলী। এদিকে দেবরাজ ইন্দ্রের হাতে রম্ভাশুরের মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এবং ত্রিলোক জয়ের উদ্দেশ্যে ব্রহ্মার বরলাভের জন্য ব্যাকুল হলে ওঠেন মহিষাসুর। তপস্যায় মগ্ন হন তিনি। তপস্যার ফল হিসাবে মহিষাসুর ব্রহ্মার বরলাভ করেন যে, দেবতা বা অসুর কেউ তাকে মারতে পারবে না। তার মৃত্যু হবে কেবল এক নারীর হাতে। দম্ভে তখন মহিষাসুর দেবতাদের রাজ্য দখল করে নেয়।
মহিষাসুরের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে দেবতারা শেষে ত্রিমূর্তি ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের শরণাপন্ন হন। এরপর তাঁদের সম্মিলিত তেজরশ্মী থেকে জন্ম নেন দেবী দুর্গা। পরমব্রহ্মের নারীশক্তি রূপে তিনি অবতীর্ণ হন। সিংহবাহিনী, দশভুজা মহাশক্তি দেবী দুর্গা হাতে নানা অস্ত্র নিয়ে মহিষাসুরের সঙ্গে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ করেন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর শারদ অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে মহিষরূপী অসুরকে বধ করেন দেবী। এভাবেই দেবীর আর এক নাম হয় মহিষাসুরমর্দিনী।
রক্তবীজ
দেবী দুর্গার মহাশক্তি পরমব্রহ্মের রূপ প্রকাশ পেয়েছে শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ করার সময়েও। রক্তবীজের বৈশিষ্ট্য ছিল অদ্ভুত। তার শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লেই সেখান থেকে জন্ম নিত আরেক রক্তবীজ। ফলে যুদ্ধ যত চলত, অসুরের সংখ্যা তত বাড়ত। রক্তবীজের রক্ত যাতে মাটিতে না পড়ে তার জন্য দুর্গা নিজের দেহ থেকেই সৃষ্টি করেন কালীকে। মা কালী রক্তবীজের শরীরের সমস্ত রক্ত পান করেন, যাতে মাটিতে এক বিন্দু রক্ত না পড়ে। ফলে তার অসীম পুনর্জন্মে ছেদ পড়ে এবং তাকে বধ করা সম্ভব হয়। এই কাহিনি প্রমাণ করে যে দেবীর প্রতিটি রূপই আসলে তাঁরই বিভূতি। একই সত্তা। আর সব শক্তি মিলিয়েই তিনি পূর্ণা।
এই হল অসুরদলণী দেবী দুর্গা। জগতের সমস্ত শক্তির তিনি আধার। মর্ত্যে মা দুর্গার সঙ্গে পূজিত হয় তার গোটা পরিবার। এমনকি তাঁদের বাহনরাও ঠাঁই পায় এই পূজায়। দেবীর আগমনে ধরিত্রী সেজে ওঠে অপরুপ সজ্জায়। পরিবারের কল্যাণে মায়ের কাছে এসে সামিল হয় আবালবৃদ্ধবনিতা।




