Sharmila Tagore and Mansoor Ali Khan Pataudi
১৯৬৯ সাল। ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মনসুর আলি খান পতৌদির সঙ্গে সাত পাকে বাঁধা পড়লেন শর্মিলা ঠাকুর। কেরিয়ারের গুরুত্বপুর্ণ সময়ে রীতিমত সাহসী একটি সিদ্ধান্ত। জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের বংশধর হয়ে অন্য ধর্মের মানুষকে বিয়ে করা নিয়ে সেসময় কম চর্চা হয়নি। তবু তিনি শর্মিলা ঠাকুর। প্রতিভা আর সাহস ছিল তাঁর শক্তি। ছক ভাঙ্গতেই তিনি ভালোবাসেন। কাউকে তোয়াক্কা না করে তাই সংসার পাতলেন নিজের ইচ্ছায়।
নবাব পতৌদির সঙ্গে শর্মিলার প্রেমকাহিনী ছিল রূপকথার মত। প্রথম আলাপ, পরিচয় পর্ব, লুকিয়ে দেখা করা, হলুদ ট্যাক্সি, একে অন্যের জন্য হন্যে হয়ে ছোটা- এসবের সবকিছুই ছিল তাঁদের প্রেমে। একসময় এই কলকাতার বুকেই জমিয়ে প্রেম করেছেন তাঁরা। ক্রিকেট দুনিয়ার সাথে বলিউড অভিনেত্রীদের গাঁটছড়া বাধার প্রথম চ্যাপ্টার হলেন তাঁরা। সে কাহিনী ভোলার নয়। কিন্তু কিভাবে শুরু হয়েছিল তাঁদের পথ চলা? নবাবি ঘরের একটি মানুষের সঙ্গে কিভাবে শর্মিলা বাকি জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলেন?
শুরু থেকেই শুরু করা ভালো। ১৯৫৯ সাল। সত্যজিৎ রায়ের সাদা-কালো পর্দায় এক অন্যরকম আবেগ নিয়ে হাজির হলেন শর্মিলা। ‘অপুর সংসার’। ভারতীয় চলচ্চিত্রে শর্মিলা ঠাকুর সত্যজিৎ রায়েরই ‘আবিষ্কার’। শর্মিলার মধ্যে তিনি পর্দার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অপর্ণা’কে খুঁজে পেয়েছিলেন। ‘অপুর সংসার’ সফল হওয়ার পর আবার ডাক এল শর্মিলার। এবার ‘দেবী’। পরিচালক সেই সত্যজিৎ রায়। পরপর দুটি বাংলা ছবিতে অভিনয়ের দক্ষতা তাঁকে টেনে নিয়ে গেল আরব সাগরের উপকূলে। শর্মিলা ছুটলেন মুম্বাই। এরপর মুক্তি পেল শক্তি সামন্তের ‘কাশ্মীর কি কলি’। বলিউডে পা রেখেই তাক লাগিয়ে দিলেন তিনি।
এদিকে ভারতীয় ক্রিকেটে তখন ‘নবাবি আমল’। মনসুর আলি খান পতৌদি ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্ব করছেন। পরিচিতি পেয়েছেন ‘টাইগার’ নামে। সিনেমাপ্রেমী হলেও পতৌদি তখনও পর্যন্ত শর্মিলার সব কয়টি ছবি দেখে উঠতে পারেননি। শর্মিলাও কিন্তু ক্রিকেট ভালবাসলেও খেলার খুঁটিনাটি সম্পর্কে তাঁর বিশেষ ধারণা ছিল না।
শর্মিলার সঙ্গে টাইগার পতৌদির প্রথম পরিচয় হয় ১৯৬৫ সালে। দিল্লিতে একটি ম্যাচ চলাকালীন। ভারতীয় দলের অধিনায়ক তখন পতৌদি। সেই ম্যাচ দেখতে হাজির হয়েছিলেন শর্মিলা। খেলার শেষে এক পার্টিতে আলাপ হল দুজনের। এটাই প্রথম আলাপ।
তার অনেক বছর পরে জিটিভিতে ‘জিনা ইসি কা নাম হ্যায়’ নামের একটি টক শোতে সঞ্চালক ফারুক শেখের কাছে পতৌদি স্বীকার করেন, আলাপ হওয়ার আগে শর্মিলার কোনো সিনেমাই নাকি তিনি দেখেননি। এমনকি চিনতেনও না তাঁকে। তবু, প্রথম আলাপের দিন থেকেই প্রেমে পড়ে গেলেন পতৌদি। তবে শর্মিলার মন পাওয়া অত সহজ ছিল না। যদিও, জানা যায়, প্রথম দর্শনে শর্মিলার মনের ওপরেও গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন নবাব।
এরপর ঘটল একটা মজার ঘটনা। মানে ঘটালেন পতৌদি নিজেই। প্রেমে শর্মিলার প্রতিক্রিয়া কি তা জানার জন্য অদ্ভুত কান্ড করে বসলেন। সিমি গ্রেওয়ালের একটি শোতে এসে তিনি নিজেই পরে খোলসা করেন একথা। স্মৃতিচারণা করে পতৌদি বলেন, কোনও একটি সূত্রে তিনি শর্মিলার ফোন নম্বর জোগাড় করে তাঁকে ফোন করেছিলেন। ফোনে শর্মিলাকে জানান, ইংল্যান্ড থেকে নাকি তাঁর জন্য একটি বিশেষ উপহার নিয়ে এসেছেন তিনি। কি সেই উপহার? ওই টক শোতে এবার শর্মিলাই বাকিটুকু বললেন। তিনি জানান, ফোনে তাঁর জন্য একটি মেসেজ ফেলে যান নবাব। সেখানে বলা ছিল নবাব নাকি তাঁর জন্য পাঁচটি ফ্রিজ এসেছেন ইংল্যান্ড থেকে! শুনে খুব কৌতূহলী হয়ে পড়েন শর্মিলা। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ।
এই ‘ফ্রিজ কাহিনী’ নিয়ে কিন্তু পরে সংবাদমাধ্যমে জোর চর্চা হয়েছিল। শর্মিলা-পতৌদির মেয়ে সোহা আলি খান ২০২১ সালে ফিল্মফেয়ারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, তাঁর বাবা নাকি সত্যিসত্যিই সাতটি ফ্রিজ পাঠিয়েছিলেন শুধু শর্মিলার প্রতিক্রিয়া জানার জন্য। শর্মিলাও পরে স্বীকার করেছেন এই মজার ঘটনা। ১৫তম ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র হট সিটে বসেও তিনি ফ্রিজের গল্পটি বলেছিলেন।
অক্সফোর্ড-শিক্ষিত পতৌদি আর বাঙালি সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা শর্মিলা- দুজনেই দুই মেরুর মানুষ ছিলেন। দুজনের ধর্ম, পেশা এমনকি ভাষা আলাদা হওয়া সত্বেও তাঁরা একে অপরের ভালোবাসেন। তাঁদের সম্পর্কে পরিবারের আপত্তি ছিল, সমাজের কৌতূহল ছিল, গুঞ্জনও ছিল। তবু কেউ কারও হাত ছাড়েননি। অবশেষে দুই পরিবার তাঁদের প্রেমে সিলমোহর দিল। তখন শর্মিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন নবাব। প্যারিসে।
ঐতিহাসিক ‘বাস্তিল দিবস’-এ প্যারিসের একটি পার্কে হাঁটছেন দুজন। হঠাৎ শর্মিলার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লেন পতৌদি। শুধু ছবিতে নয়, বাস্তবেও শর্মিলার জীবনে এসেছিল ‘ইভনিং ইন প্যারিস’। নবাব প্রস্তাব দিলেন তাঁকে বিয়ে করার। শর্মিলা-পতৌদির বিয়ে হল। ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৭ তারিখ। বলা বাহুল্য, ‘অ্যান ইভিনিং ইন প্যারিস’ ছবিতে প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী হিসেবে শর্মিলা বিকিনি পরে শট দিয়েছিলেন। বলিউডের ইতিহাসে সে এক টালমাটাল পর্ব।
শর্মিলা এবং টাইগার দুজন বরাবরই খুব আবেগপ্রবণ ছিলেন। যখন যা মনে হয়েছে তাই করেছেন। বল্গাহীন প্রেমে ভেসেছেন দুজন। বিয়ের পরেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। তবে, সইফ জন্মানোর পর তা অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছিল বলে শোনা যায়। পতৌদির সঙ্গে বিয়ের পরেও শর্মিলা অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে আনেননি। ‘আরাধনা’, ‘অমর প্রেম’ তাঁর বিবাহ পরবর্তী জীবনের দুটি হিট ছবি। জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর বাড়ির ঐতিহ্য থেকে বলিউড তারপর পতৌদির সঙ্গে তাঁর ৪২ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছেন। তারপর আচমকা একদিন একা হয়ে পড়লেন তিনি। ২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। শর্মিলাকে রেখে চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিলেন মনসুর আলি খান পতৌদি।
সব ছবি– সাবা আলি খানের ইনস্টাগ্রাম থেকে
আরও পড়ুন – অক্ষয় কুমারের সঙ্গে নাম জড়ায় এই বলি নায়িকার, খবর জানা মাত্রই ‘হুমকি’ দিয়েছিলেন রবিনা
আরও পড়ুন – ফারহান আখতার প্রযোজিত মণিপুরের ছবি ‘বুং’-এর বাফটা জয়





