Sunday, March 8

বিনোদন

মীনা কুমারী, ‘পাকিজা’ ও কামাল আমরোহী

প্রায় বছরখানেক লেগে গেল ‘পাকিজা’কে নিয়ে নতুন করে ভাবতে। ১৯৬৮ সালে আমরোহি মীরাকে উদ্দেশ্যে করে একখানি চিঠি লিখলেন। এছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিলনা।
মীনা কুমারী, 'পাকিজা' ও কামাল আমরোহি
'ট্রাজেডি কুইন' মীনা কুমারী। ছবি- ইনস্টাগ্রাম।

Pakeezah

অনেকে ভেবেছিলেন তিনি বোধহয় পাগল। চিত্রনাট্য অনুযায়ী শুটিং লোকেশন খুঁজতে চষে বেড়িয়েছেন গোটা দেশ। শুধুমাত্র শুটিং নয়, সিনেমায় তারকাদের গয়না কিনতেও তিনি ভারত ভ্রমন করেছেন। ছুটেছেন হয় বারাণসী, না হয় জয়পুর তো একবার ত্রিবান্দ্রম। এমনকি গল্পের ‘কবরস্থান’-এর খোঁজে একবার তো তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন ডাকাতে চম্বল উপত্যকায়। চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে সেখানে টিলার ওপর অবস্থিত একটি শুনশান কবরস্থান দেখে তাঁর পছন্দ হয়। কিন্তু শেষমেষ ছেড়ে দিতে হল সেই স্পট। নেপথ্যে ছিল সন্দেহ। যদি দর্শক এটাকেও স্টুডিওতে সাজানো সিনেমার সেট বলে মনে করে। সিনেমার গল্পকে পর্দায় বাস্তব করে তুলতে বিন্দুমাত্র আপোষ করতেন না তিনি। এমনই ছিল তাঁর শিল্পের প্রতি ভালোবাসা। তিনি পরিচালক কামাল আমরোহী। যাঁর আজীবন কালের সাধনার ফল হল মীনা কুমারী অভিনীত ‘পাকিজা’।

১৮ জানুয়ারি ১৯৫৮। মাটিতে বসে হাত জোড় করে প্রার্থনা করছেন পরিচালক কামাল আমরোহী ও তাঁর স্ত্রী- কিংবদন্তি মীনা কুমারী। তখনই ছবির নামকরণ করা হয় ‘পাকিজা’। যদিও কুসংস্কারের কারণে এই নাম কয়েকবার বদলানোর কথা উঠেছিল, তবে শেষপর্যন্ত মূল নামই থেকে যায়। ‘পাকিজা’কে প্রথমে সিনেমাস্কোপে সাদাকালো ছবিতে নির্মাণ করার পরিকল্পনা ছিল। কাহিনীর কেন্দ্রে ছিলেন একমাত্র নারী চরিত্র ‘সাহিবজান’। সবচেয়ে বড় কথা ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ মীনা কুমারীকে মাথায় রেখেই আদ্যোপান্ত এই ছবির চিত্রনাট্য লেখা হয়েছিল।

‘দায়েরা’ ছবির ব্যর্থতার পর থেকেই একটা গল্প ঘুরে ফিরে আসছিল আমরোহীর মনে। তিনি এমন একটি ছবি বানাতে চাইছিলেন যা শুধুমাত্র তাঁর স্ত্রীকে ঘিরেই তৈরি হবে। স্ত্রীর প্রতি তাঁর ‘অপূর্ণ’ ভালোবাসার মর্যাদা দিতেই এই ছবিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল তাঁর কাছে। আমরোহী নিজে একবার স্বীকার করেছিলেন, ‘পাকিজা’র প্রতিটি সংলাপ তিনি লিখেছেন মীনাকে ভেবে। তাঁর ইচ্ছে ছিল, পর্দায় মীনাকে এমনভাবে তুলে ধরতে যাতে তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যতদূর পর্যন্ত তিনি পরিচিত ছিলেন, যেন তার সবটাই ধরা পড়ে ছবিতে। আমরোহীর ভাষ্যে, সম্রাট শাহজাহান যেমন মুমতাজের স্মৃতিতে তাজমহল তৈরি করেছিলেন, তেমনি তিনিও মেহজবিনের জন্য ‘পাকিজা’ বানাতে চান। উল্লেখ্য, মীনা কুমারীর আসল নাম ছিল মেহজবিন। যাইহোক, পরিকল্পনা মত ১৯৫৬ তেই শুরু হয়ে যায় ছবির কাজ। কিন্তু যত সময় গড়াল, পাকিজার সামনে আসতে থাকল একের পর এক জটিলতা। একসময় পরিস্থিতি এমন তৈরি হল, বন্ধই হয়ে গেল ছবির কাজ। তাও আবার দু-এক বছরের জন্য নয়, দীর্ঘ ৫ বছর। ১৯৫৬ থেকে শুরু করে ১৯৭২ সালে এসে পর্দায় মুক্তি পেল ‘পাকিজা’। দীর্ঘ প্রায় এই ১৫ বছরে ছবির নির্মাণকালে ঘটেছিল অসংখ্য ঘটনা।

১৯৫০ সালে ফণী মজুমদারের ‘তামাশা’ ছবির শুটিং চলাকালীন মীরা কুমারীর সঙ্গে পরিচয় হল তরুণ পরিচালক কামাল আমরোহীর। পরিচয় করিয়ে দিলেন অশোক কুমার। কামাল সেসময় তাঁর ‘আনারকলি’ ছবির জন্য নতুন মুখ খুঁজছেন। মীনাকে দেখেই তিনি মনস্থির করে ফেললেন ‘আনারকলি’তে তিনি তাঁকেই নেবেন। অতঃপর, ১৯৫১ সালের মার্চ মাসে মীরা পাকাপাকিভাবে সই করলেন ছবির চুক্তিপত্রে।

‘আনারকলি’র শুটিং শুরু হওয়ার ঠিক আগে মস্ত এক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হলেন মীরা। সপরিবারে মহাবালেশ্বর থেকে ফিরছিলেন তিনি। গাড়ির সামনে বসে থাকায় মীনা কুমারী সাংঘাতিক জখম হলেন। তড়িঘড়ি তাঁকে ভর্তি করা হল পুনের একটি হাসপাতালে। খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে পুণে ছুটলেন আমরোহী। এক গ্লাস মুসম্বি লেবুর রস নিয়ে হাজির হলেন হাসপাতালে। মীরার মাথা তুলে খাইয়ে দিলেন। সেদিন বোঝা গিয়েছিল, মীরা আর কামালের সম্পর্ক শুধু আর পরিচালক নায়িকাতেই আটকে নেই। এরপর তাঁরা একে অপরের কাছে নতুন নামে পরিচিত হলেন- মঞ্জু ও চন্দন।

১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একরকম লুকিয়েই বিয়ে সেরে ফেললেন মীরা ও কামাল। কিন্তু এই বিয়েতে আদৌ সায় ছিলনা মীরার বাবা আলি বক্স-এর। কারণ ছোট থেকেই আলি বক্স মীরাকে ‘টাকার মেসিন’ বলেই মনে করতেন। বিয়ে হয়ে গেলে সে কি আর সম্ভব হত? বিয়ের খবর বেশ কয়েকমাস গোপন রাখা গেল। কিন্তু তারপর খবর যখন তাঁর কানে গিয়ে পৌঁছাল, মীনার সঙ্গে শুরু হল বচসা। পরিস্থিতি এরকম হতে পারে আগে থেকে আঁচ করতে পেরেছিলেন মীনা। তাই কামালকে তিনি আগেই রাজি করিয়েছিলেন আলি বক্সের হাতে ২ লক্ষ টাকা তুলে দেওয়ার জন্য।

সেই ছোট থেকেই মীনা বাবার হাতে অবহেলিত। জন্মানোর পর তো মীরাকে তিনি এক অনাথ আশ্রমের বারান্দায় রেখে আসতে গিয়েছিলেন। মীরাকে রেখে আলি বক্স যখন ফিরে আসছেন, তখন শিশু মীরার তীব্র কান্নার শব্দে তাঁকে ফিরে যেতে হয়েছিল। ততক্ষণে ছোট্ট মেহজবিনের সারা গায়ে লাল পিঁপড়ে ছেঁকে ধরেছে। অগত্যা মেয়েকে নিয়েই ঘরে ফিরতে হয়েছিল তাঁকে। তখন থেকেই আলি বক্স ভেবেছিল মীরাকে তাঁদের ছেলের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ, প্রথম সন্তানের পর মীরা জন্মানোর সময় মাতাপিতা চেয়েছিলেন এবার ছেলে সন্তান হোক। তা হয়নি। হয়তো বাবামায়ের সেই ‘রোষ’ থেকেই মীরার আর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। এমনকি ছোটবেলায় খেলার সুযোগও পাননি তিনি। তার বদলে, আলি বক্স ছোট মেহজবিনকে নিয়ে হাজির হলেন ফিল্মের অডিশনে। কি মর্মান্তিক!

সুতরাং কামালের সঙ্গে মীরার বিয়ে তিনি যে ভাঙতে যাবেন তাতে বোধহয় অবাক হওয়ার মত কিছু ছিল না। উপায় না দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন মীরা। তখন কামালের ‘দায়রা’ ছবির শুটিং শুরু হয়েছে। কয়েকদিন পর শুটিং থেকে মীরা বাড়ি ফিরে এলেন। কিন্তু বাবা আলি বক্স দরজা খোলেননি। অসহায় মীরাকে সেদিন গিয়ে উঠতে হল কামালের বাড়িতে। শুরু হল নতুন সংসার। খুব অল্প সময়েই মীরা কামালের পরিবারে মিশে গেলেন। কামালের ছোট ছোট বাচ্চাদের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন ‘ছোটি মা’। মীরার স্বভাবই ছিল এমন। খুব সহজেই তিনি আপন করে নিতেন সবাইকে।

১৯৫৬ সাল নাগাদ কামাল এবং মীরা আজাদ ছবির শুটিংয়ের জন্য দক্ষিণ ভারতে গেলেন। সেখানেই শুটিংয়ের ফাঁকে একজায়গায় বসে প্রথম ‘পাকিজা’ তৈরি করার পরিকল্পনা হল। কথা অনুযায়ী কাজ। কামাল নিজের হাতে লেখা শুরু করলেন ছবির চিত্রনাট্য। শুরু হল মূল চিত্রগ্রহণের কাজ। দায়িত্ব নিলেন প্রখ্যাত জার্মান চিত্রগ্রাহক যোশেফ উইরশিং।

১৯৬০ সালের মধ্যে আমরোহী চিত্রনাট্য শেষ করে ফেললেন। ছবির টাইটেল থেকে শেষ ফ্রেম পর্যন্ত সবকিছুই চিত্রনাট্যে ছবির মত লেখা হয়েছিল। কামাল আমরোহীর কাজের ধরন ছিল এমনই। একবার লেখার পরে খুব বেশি আর পরিবর্তন করতে হত না। ১৯৬০ সালের চিত্রনাট্যে যা লেখা হয়েছিল, ১৯৭২-এ ‘পাকিজা’ পর্দায় মুক্তি পাওয়ার সময় তা প্রায় একই ছিল।

আমরোহী ছিলেন উচ্চাভিলাষী। তিনি ‘পাকিজা’-য় মহাকাব্য লিখতে চেয়েছিলেন। অসংখ্য এক্সট্রা, ব্যয়বহুল ও বৈচিত্র্যময় সেট, যুগের আবহ রক্ষায় অতিমানবীয় প্রচেষ্টা। সিনেমা জগতের প্রায় দুই দশকের পেশাদারি দক্ষতা তিনি ঢেলে দিতে চেয়েছিলেন এই ছবিতে। আসলে আমরোহি পরিচালক কে. আসিফ-এর ‘মুঘল-এ-আজম’ কে ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘মুঘল-এ-আজম’ ছবির সংলাপের সিংহভাগ কিন্তু লিখেছিলেন কামালই। আমরোহি দৃশ্যবৈভব ও সিনেম্যাটিক কারুকার্যে আসিফকে ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন।

১৯৬১ সালে পাকিজার শুটিং শুরু হল। শুটিং শুরু করার আগেই শেষ হয়ে গেল ছবির সমস্ত গানের রেকর্ড। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ ছবির কাজ পুরোদমে চলল। তবে সমস্যা ছিল হাজারও। মীনা কুমারী বলিউডে তখন অত্যন্ত ব্যস্ত নায়িকা। অন্যান্য ছবির কাজ করার পর মাসে মাত্র কয়েকটা দিন দিতে পারতেন ‘পাকিজা’র জন্য। আর কামালও তখন তাড়াহুড়ো করতে নারাজ। ‘পাকিজা’ ছিল তাঁর শ্রমের ফসল, প্রেমের উপাখ্যান। যতক্ষণ না ঠিকঠাক শট নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি সন্তুষ্ট হতেন না।

‘পাকিজা’র পরিণতি পুরোপুরি নির্ভর করছিল দু’জন মানুষের ওপর। মীনা কুমারী এবং কামাল আমরোহী। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক ভালো থাকলে কাজ দ্রুত হত, খারাপ হলে ঝিমিয়ে পড়ত। বলা বাহুল্য, ১৯৬৪ সাল নাগাদ ছবির জন্য প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা খরচ হয়ে গিয়েছিল। শুধু ছবির সেট তৈরির জন্য খরচ হয়ে গেল বাজেটের সিংহভাগ। ঠিক এমন সময় ঘটল দুর্ঘটনা। মীনা কুমারী কামালের বাড়ি ছাড়লেন। ভিতরে ভিতরে তাঁদের সম্পর্কে যে ফাটল ধরেছিল তা এবার প্রকাশ্যে চলে এল। আর সেই সঙ্গে অথৈ জলে পড়ে গেল তাঁদের প্রেমের ফসল ‘পাকিজা’।

প্রেম বোধহয় চিরকালই এরকম। শুরু হয় একরকম, আর শেষ হয় আর একরকম। চোখ থেকে না জল ঝরলে বোধহয় প্রেম সার্থক হয়না। মীরার ক্ষেত্রে তার অন্যথা হলনা। করছিলেন সুখের সংসার। আলি বক্সের হাত থেকে ‘মুক্তি’ পেয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছিলেন। কেরিয়ারও চলছিল সাফল্যের সঙ্গে। আচমকা মীরার জীবনে কোত্থেকে যেন আবার ঘনিয়ে এল অশান্তির কালো মেঘ। এ যেন ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। যে কামাল অসুস্থ মীনা কে দেখার জন্য ছুটে গিয়েছিলেন পুণে, সেই কামালই এবার স্বামী হয়ে শর্ত চাপিয়ে দিলেন তাঁর ওপর। কি ছিল সেই শর্ত? প্রথমত, মীনার মেকআপ রুমে মেকআপ আর্টিস্ট ছাড়া আর কেউ ঢুকতে পারবে না। দুই, মীনার গাড়িতে কোনও পুরুষ সহকর্মী উঠতে পারবে না। তিন, যত ব্যস্ততাই থাক, মীনাকে বাড়ি ফিরতে হবে সন্ধে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে। এক মুহূর্তে মীনার আবার মেহজবিনকে মনে পড়ল। সেই ছোটবেলা। তাঁর প্রতি তাঁর বাবার চাপানো সংসার চালানোর বোঝা।

প্রথমদিকে মীনা আমরোহীর সব শর্তই মেনে নিয়েছিলেন। তবে বেশিদিন তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যদিও মীরার অভিনয় পেশা নিয়ে কামালের কোনো অভিযোগ ছিল না। এদিকে মীরার ওপর নজর রাখতে লোক ঠিক করলেন আমরোহি। সচিব বাকর আলিকে দায়িত্ব দিলেন মীরার চলাফেরা লক্ষ্য করার জন্য। একবার বাকর মীরার মেকআপ রুমে আচমকা ঢুকে গুলজারকে দেখতে পেয়ে সপাটে চড় কষিয়ে দিলেন মীরার গালে। অপমানে মীনা কামালকে ফোন করলেন তৎক্ষণাৎ। কামাল কিন্তু সেদিন আসেননি মীরার সেটে। মীরাও ফিরলেন না কামালের বাড়িতে। উঠলেন তাঁর বোন মধুর বাড়িতে। প্রথমে কামাল তাঁকে ফেরার জন্য দু একবার অনুরোধ করলেও, পরে তা বন্ধ করে দিলেন।

১৯৬৪ সালে কামাল এবং মীনা আইনত আলাদা হয়ে গেলেন। বন্ধ হয়ে গেল ‘পাকিজা’র শুটিং। এর বেশ কয়েকবছর আগে থেকেই মীনা নিয়মিত মদ্যপান শুরু করেছিলেন। কামালের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তা আরো বেড়ে গেল। অতিরিক্ত সুরাপানের বিষ ধীরে ধীরে মীনাকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

সিনেমা জগতে মীনা কুমারী স্বেচ্ছায় আসেননি। নিয়তি তাঁকে বাধ্য করেছিল এই পেশা বেছে নিতে। সেই পেশাই শেষপর্যন্ত তাঁকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিচ্ছিল। একবার একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “ভেবেছিলাম স্কুলে যাব, বন্ধুদের সঙ্গে খেলবে, কিন্তু সে আর হয়ে ওঠেনি।” ছোটবেলায় পড়াশুনার প্রতি তাঁর তীব্র ইচ্ছা ছিল। তা যখন হলনা, বাড়িতেই শুরু হল পাঠ। শুটিংয়ের ফাঁকে জেটুকু সময় পেতেন চলত পড়াশুনা, সে গল্পের বই হোক বা কবিতার। ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি এজন্য নাম পেলেন ‘রিডিং মেহজবিন’।

এখন প্রশ্ন ছিল ‘পাকিজা’র ভবিষ্যৎ নিয়ে। বাকর আলি বলেছিলেন, বিচ্ছেদের আগে কামাল মীনাকে প্রস্তাব দিয়েছিল, “তুমি যেতে চাও জানি। আমি সাহায্য করব। শুধু কথা দাও, পাকিজা শেষ করবে।” যদিও মীনা চলে যাওয়ার পর একাধিকবার কামালকে আশ্বস্ত করে বলেছিল, “ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে, পেশাগত নয়।” কিন্তু বিগত কয়েকবছর দুজনের সম্পর্কের মাঝে যে ফাটল ধরেছিল, সেই তিক্ততার মধ্যে পাকিজার কাজ আর এগোয়নি। স্ত্রী পাশে না থাকার কারণে একসময় আমরোহি তো ছবিটি ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন।

প্রায় বছরখানেক লেগে গেল ‘পাকিজা’কে নিয়ে নতুন করে ভাবতে। ১৯৬৮ সালে আমরোহি মীরাকে উদ্দেশ্যে করে একখানি চিঠি লিখলেন। এছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিলনা। চিঠিতে ‘পাকিজা’র প্রতি তাঁর অনুভূতি এবং ভালোবাসকে উজাড় করে দিয়ে লিখলেন, “তোমাকে বিচ্ছেদ দিতেও আমি রাজি আছি, শুধু ছবিটা শেষ করার জন্য তোমার কাছে অনুরোধ করছি।”

মীনা ফিরলেন। তবে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে। ততদিনে কেটে গেছে প্রায় পাঁচ বছর ১২ দিন। ১৬ মার্চ ১৯৬৯ আবার শুরু হল অসমাপ্ত ছবির কাজ। পেড়া খাইয়ে সেটে মীনা কুমারীকে অভিবাদন জানালেন কামাল আমরোহী। এই সময় মীনা কুমারীর কাছে অন্য কাজ কম ছিল। মুখ্য চরিত্রের জন্য প্রায় কোনো ছবিতেই তিনি সুযোগ পাচ্ছিলেন না। কারণ তাঁর অসুস্থতা। সুতরাং, কামাল আমরোহীর প্রস্তাব তিনি ফেললেন না। স্টুডিওতে মীনাকে সাদর অভ্যর্থনায় গ্রহণ করা হল। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ শেষ তিন বছর টানা শুটিং চলল। অসুস্থতার মধ্যেও মীনা কুমারী তাঁর সর্বস্ব নিংড়ে দিলেন।

শোনা যায়, ‘পাকিজা’র সেটে মীনা কুমারীর ফিরে আসার নেপথ্যে আর একটি বড় কারণ ছিল কামাল আমরোহীর ছেলে, তাজদার আমরোহী। মীনা কুমারীকে তাজদার ‘ছোটি আম্মি’ বলে ডাকতেন এবং দুজনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। একবার তাজদার আমরোহি বলেছিলেন, “আগর ম্যায় না হোতা তো পাকিজাহ শায়দ বন নহি পাতি।” তাঁর মতে, “পাকিজা শেষ পর্যন্ত তৈরি হওয়ার কৃতিত্ব অনেকেই নিয়েছেন। সত্যিটা হল, ছোটি আম্মি আমাকে মনেপ্রাণে এবং নিঃশ্বার্থভাবে ভালোবাসতেন। তিনি বাবার সাথে তাঁর মনোমালিন্য দূর করে দিয়েছিলেন এবং আমার প্রতি তাঁর স্নেহের জন্যই তিনি ছবিটি সম্পূর্ণ করেছিলেন।”

‘পাকিজা’ পুনরায় শুরু হওয়ার পর একবার একটি আউটডোর শুটিং থেকে ফেরার পথে মজার ঘটনা ঘটেছিল। মধ্যপ্রদেশ থেকে শুটিং করে ফেরার সময় ইউনিট গাড়ির তেল ফুরিয়ে যায়। আর সেইসময় ডাকাতরা ঘিরে ধরে তাদের গাড়ি। আশ্চর্যজনকভাবে, সেই গ্যাংয়ের সর্দার ছিলেন মীনা কুমারীর ভক্ত। এটা জানার পর ডাকাতরা মীনা কুমারী এবং তার দলের প্রত্যেকটা সদস্যের আতিথেয়তার খামতি রাখেননি। এমনকি, ডাকাত সর্দার একটি ছুরি মীনার হাতে দিয়ে বলেছিল, “আমার হাত কেটে তুমি তোমার নিজের নাম লিখে দাও।” অভিনব সেই অটোগ্রাফ মীনা কুমারী দিয়েছিলেন। বহু কষ্টে।

‘পাকিজা’র শুটিং যখন শুরু হয়েছিল তখন ছবির সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত জার্মান চিত্রগ্রাহক জোসেফ উইর্শিং এবং সঙ্গীতে ছিলেন কিংবদন্তি গুলাম মোহাম্মদ। ১৯৬৯ সালে শুটিং পুনরায় শুরু হওয়ার আগেই দুজনের মৃত্যু হয়। গোলাম মোহাম্মদ তাঁর শেষ জীবনের কয়েকটি বছর অত্যন্ত দারিদ্র্য ও অসুস্থতার মধ্যে কাটিয়েছিলেন। ‘পাকিজা’-তে
প্রথমে মীনা কুমারীর বিপরীতে নায়ক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন অশোক কুমার, পরে সেই চরিত্র ঘুরে যায় একাধিক অভিনেতার কাছে। একে একে সম্ভাবনার তালিকায় উঠে আসে রাজেন্দ্র কুমার, সুনীল দত্ত ও তরুণ ধর্মেন্দ্রর। এর মধ্যে ধর্মেন্দ্রর নাম প্রায় নিশ্চিত হলেও, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতায় সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত ‘পাকিজা’র জন্য আমরোহি নির্বাচিত করেন রাজ কুমারকে।

১৯৭২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি, মুম্বইয়ের মারাঠা মন্দিরে প্রিমিয়ার হল ‘পাকিজা’। দেড় কোটির ছবি, পনেরো বছরের পরিশ্রম। কিন্তু প্রথম দিনে দর্শক কেমন নিরুত্তাপ হয়ে রইল। ‘পাকিজা’ মুক্তি পাওয়ার পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন মীনা কুমারী। ২৮ মার্চ ১৯৭২ তাঁকে ভর্তি করানো হল হাসপাতালে। দু-দিন রইলেন সেখানে। কোমায়। তারপর ৩১ মার্চ ৩৯ বছর বয়সে শেষবারের মোট চোখ বুজলেন। হয়তো পাকিজার মুক্তির অপেক্ষায় তাঁর মৃত্যুও অপেক্ষা করে ছিল। মীনা কুমারীর মৃত্যুর কারণ ছিল লিভার সিরোসিস। হিন্দি সিনেমার ‘ট্রাজেডি কুইন’ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যুকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন তাঁর দিদিতুল্য বন্ধু, নার্গিস। অন্যদিকে ‘পাকিজা’ তখন কাঁপাচ্ছে বক্স অফিস।

 

তথ্যসূত্র– ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ‘মীনা কুমারী: দ্য ক্লাসিক বায়োগ্রাফি’ – বিনোদ মেহতা

আরও পড়ুন – আরও ভয়ঙ্কর রণবীরের হামজা, ‘ধুরন্ধর ২’-এর ট্রেলারে শুধুই প্রতিশোধের আগুন

আরও পড়ুন – শর্মিলাকে ইমপ্রেস করতে নাকি ৭টা ফ্রিজ পাঠিয়েছিলেন টাইগার পতৌদি

ফলো করুণ-