Monday, January 26

তর্পণ কি? মহালয়ার ভোরে তর্পণ করার তাৎপর্য কি?

তর্পণ কি? মহালয়ার ভোরে তর্পণ করার তাৎপর্য কি?
গঙ্গার ঘাটে মহালয়ার ভোরে তর্পণ। ছবি- সংগৃহীত।

মহালয়ার ভোরে তর্পণ

শ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথি মহালয়া নামে পরিচিত। মহালয়া মানেই দেবীপক্ষের সূচনা অর্থাৎ দুর্গোৎসবের সূচনা, কিন্তু পাশাপাশি এটি পিতৃপক্ষেরও সমাপ্তি। মহালয়ার ভোরে তর্পণ করার রীতি চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। এই দিন ভোরবেলায় নদী বা পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে ফুল, জল নিবেদন করা হয়।

তর্পণ কি?

‘তর্পণ’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘তৃপ’ থেকে, যার অর্থ হল ‘সন্তুষ্ট করা’ বা ‘তুষ্টি প্রদান’। তর্পণ হল আসলে অর্ঘ্য নিবেদনের মাধ্যমে পূর্বপুরুষের আত্মাকে শান্তি দেওয়ার আচার। তর্পনে কুশ, তিল, জল, ধান, দুধ, মধু, মিষ্টি, ফল ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। ডান হাতে জল নিয়ে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে তা অর্ঘ্য হিসাবে জলে নিবেদন করা হয়। তর্পণ কেবল প্রয়াত আত্মাদের উদ্দেশ্যেই নয়, দেবতা ও ঋষিদের প্রতিও তর্পণ করার নিয়ম আছে। তবে মহালয়ার দিন সকালে মূলত ‘পিতৃতর্পণ’ই প্রধান।

পিতৃপক্ষের তাৎপর্য

পিতৃপক্ষ শুরু হয় ভাদ্র মাসের পূর্ণিমার পরদিন, অর্থাৎ কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে। সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষের সূচনা হয়। টানা ১৫ দিন ধরে চলে এই পক্ষ, যা শেষ হয় আশ্বিন অমাবস্যায়, অর্থাৎ মহালয়ার দিন। এই সময়কেই বলা হয় ‘পিতৃপক্ষ’। শাস্ত্রমতে, এই ১৫ দিনে পিতৃপুরুষেরা তাঁদের উত্তরপুরুষের হাত থেকে জলগ্রহণের জন্য পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য বংশধরেরা তর্পণ করলে আত্মারা তুষ্ট হন এবং পরিবারের কল্যাণ সাধন হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, স্বর্গলোক ও মর্ত্যলোকের মাঝেই আছে পিতৃলোক। পিতৃলোকের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হলেন যমরাজ। তিনি পাপ-পুণ্যের হিসেব রাখেন এবং পিতৃলোকের শাসনভার পালন করেন। কোনো জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী মৃত তিন পুরুষ এই পিতৃলোকেই বসবাস করেন। পরিবারের কারোর মৃত্যু হলে তাঁর আগের প্রজন্মের একজন পূর্বপুরুষের আত্মা পিতৃলোক থেকে স্বর্গলোকে গমন করে।

মহালয়ার ভোরে তর্পণ: দাতা কর্ণের কাহিনি

পিতৃপক্ষের মাহাত্ম্য নিয়ে মহাভারতে একটি উল্লেখযোগ্য কাহিনি রয়েছে। দাতা কর্ণের মৃত্যুর পর তাঁর আত্মা স্বর্গে গমন করলে সেখানে খাদ্য হিসাবে তাঁকে সোনাদানা ও ধণরত্ন দেওয়া হয়। ক্ষুধার্ত অবস্থায় কর্ণ বিস্মিত হয়ে বলেন, তিনি তো সারাজীবন দানধ্যান করে এসেছেন, তবে কেন তাঁকে অন্ন ও জল দেওয়া হচ্ছে না। কর্ণের এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁকে বলা হয় যে, কর্ণ জীবনে সবকিছু দান করলেও, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে কখনো তিনি অন্ন বা জল দান করেননি। তর্পণের মাধ্যমে পিতৃপুরুষদের সন্তুষ্ট করেননি। সেই কারণে স্বর্গে তাঁকে অন্ন বা জল না দিয়ে স্বর্ণ ও রত্ন দেওয়া হচ্ছে। এই কথা শুনে কর্ণ তখন অনুতপ্ত হন। কর্ণ অবাক হয়ে বলেন যে তিনি আগে পিতৃপুরুষের কথা জানতেন না। কুরুক্ষেত্রে পাণ্ডব এবং কৌরবদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের রাতে মা কুন্তীর কাছ থেকে জানতে পারেন যে তিনি তাঁর সন্তান। পিতৃপুরুষ সম্বন্ধে এই প্রথম তিনি জ্ঞানলাভ করেন। তারপর যুদ্ধে মৃত্যুর পর তিনি স্বর্গে এলেন। পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে খাদ্য ও জল না করা তাই তার অনিচ্ছাকৃত ভুল। তিনি প্রার্থনা করেন পৃথিবীতে পুনরায় ফিরে আসার, যাতে তিনি নিজের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে পারেন। যমরাজ তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করেন এবং তাঁকে ১৬ দিনের জন্য পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন। কথামত কর্ণ পৃথিবীতে ফিরে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে অন্নজল দান করেন। এই ১৬ দিন আজ পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত।

অমাবস্যা তিথির তাৎপর্য

শাস্ত্রমতে, মহালয়ায় অমাবস্যা তিথিরও গুরুত্ব রয়েছে। অমাবস্যা হল প্রেতকর্ম বা পিতৃকর্মের জন্য প্রশস্ত। এই সময় চন্দ্র ও সূর্য দুই-ই আকাশে অদৃশ্য থাকেন, ফলে পিতৃলোকের সঙ্গে পৃথিবীর যোগসূত্র প্রগাঢ় হয় বলে মনে করা হয়। তাই মহালয়ার ভোরে অমাবস্যা তিথিতেই পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ সম্পাদন করা হয়। তর্পণে জলদানই প্রধান কাজ। বিশ্বাস করা হয়, সূর্য ওঠার আগেই আত্মারা পিতৃলোকে ফিরে যান, তাই ভোরের আলো ফোটার আগেই তর্পণ সম্পন্ন করার নিয়ম।

এবছর ৪ আশ্বিন, ইংরাজি ২১ সেপ্টেম্বর, রবিবার মহালয়া অর্থাৎ পিতৃপক্ষের শেষ দিন।