Saturday, August 30

Sholay@50

50 Years of Sholay: কিংবদন্তি শোলে, মুক্তির পঞ্চাশ বছর পরেও কমেনি তার জৌলুস

গসিপের বাজারে বিষ ছড়িয়ে পড়ছিল। কেউ কেউ ছবির নাম বিকৃত করে বলল ‘ছোলে’। আবার কেউ বিদ্রূপ করে বলল ‘তিন মহারথী আর এক চুহা’র গল্প। অনেকে বললেন, এ ছবির সবকিছুই ভুলে ভরা, এত রক্তপাত দেখতে কেন মানুষ পরিবার নিয়ে হলে আসবে? জয়-বীরুর ‘দোস্তি’কে  অত্যন্ত খারাপ স্বাদের বলে উপহাস করা হল।

Share

ছবি- সংগৃহীত

ভারতীয় চলচ্চিত্রের মহীরূহ ‘শোলে’। সিনেমার ইতিহাসে এক অন্যন্য মাইলস্টোন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট মুক্তি পেয়েছিল তারকাখচিত ছবিটি। যা কেবল একটি সাধারণ সিনেমা নয়, হয়ে উঠেছিল জাতীয় আবেগ। কিংবদন্তী শোলের কিংবদন্তী হয়ে ওঠার পিছনে লুকিয়ে ছিল অবিশ্বাস্য এক কাহিনী। ‘শোলে’র সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে সেই কাহিনীকে একবার পিছু ফিরে দেখা প্রয়োজন।

ছবি- ইনস্টাগ্রাম

রমেশ সিপ্পি পরিচালিত ‘শোলে’ ৫০ বছর পেরিয়ে এলেও, এই ছবির আবেগ এবং আবেদন আগের মত ঠিক ততটাই তাজা। জনপ্রিয়তা কমেনি কোনো অংশে। বরং সময়ের সাথে সাথে হয়ে উঠেছে এক বিমুর্ত স্মৃতি, একটি না ক্ষয় হওয়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভারতীয় চলচিত্র জগতের ঐতিহাসিক বিস্ময়। এই ছবির গল্প, চরিত্র, সেটের বিস্তার, মুক্তির পর প্রথমেই মুখ থুবড়ে পড়া, ফিনিক্স পাখির মত পুনরায় বেঁচে ওঠা- সবেতেই জড়িয়ে আছে এই ছবির কিংবদন্তী হয়ে ওঠার কাহিনী।

ছবি- সংগৃহীত

১৫ আগস্ট ১৯৭৫- স্বাধীনতা দিবসের দিন ছবিটি প্রথমবারের জন্য দর্শকদের সামনে এসেছিল। রমেশ সিপ্পি, ছবির অভিনেতা অভিনেত্রী এবং কলাকুশলীরা সেদিন অন্যরকম কিছু ঘটার আশায় ছিলেন। তাঁরা উচ্ছসিত ছিলেন। ভেবেছিলেন যে তাঁরা হয়তো অসামান্য কিছু ঘটতে দেখবেন।

ছবি- সংগৃহীত

‘শোলে’র সাফল্যকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল। জিপি সিপ্পি এবং তাঁর সিপ্পি ফিল্মস এই ছবিতে ৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে যা অন্য যেকোনো বলিউড প্রযোজনার থেকে নিঃসন্দেহে বেশি ছিল। প্রায় আড়াই বছর ধরে শ্যুট করা ছবিকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ যেন ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছিল।

ছবি- ইনস্টাগ্রাম

১৫ আগস্ট মিনার্ভা থিয়েটারের পর্দায় ঝলসে উঠল ৭০মিমির দৃশ্য। গর্জে উঠল গব্বরের শীতল আওয়াজ, ছুটন্ত ট্রেনে জয় আর বীরুর রুদ্ধশ্বাস লড়াই, ঠাকুরের প্রতিশোধের স্পৃহা আর বাসন্তীর বকবকানি। হল জুড়ে আর ডি বর্মণ, কিশোর কুমার, মান্না দে, লতাজীর কণ্ঠ সুরের মূর্চ্ছনা ছড়ালো। তবু দর্শক যেন বসে রইল পাথরের মতন। বাকহীন, নীরব, নিস্তব্ধ শ্মশানে পরিণত হল চারদিক। না হাততালি, না সিটি। দর্শকদের মধ্যে থেকে ফিসফিস করে ছড়িয়ে পড়ল তিন-চারটি শব্দ- তবে কি ফ্লপ? 

ছবি- সংগৃহীত

প্রিমিয়ার সপ্তাহ- মুক্তির পরের দিন সকালে কাগজে-কলমে ফুটে উঠল ‘শোলে’র কঠোর সমালোচনা। শুরু হল ছবি নিয়ে বিদ্রুপ, ঠাট্টা, তামাশা। গব্বরের হাসি নিয়ে তীব্র কটাক্ষ। দিলীপ কুমার ছবি পছন্দ করলেন, তবে ট্রেন ডাকাতির দৃশ্য নিয়ে বললেন- ‘এত উচ্চমাত্রায় শুরু হলে পরে আর কোথায় গিয়ে পৌঁছবে গল্প?’ রাজ কাপুর বললেন, ‘ভালো’, তবে আর একটু বেশি রোম্যান্স থাকলে মন্দ হত না।

ছবি- সংগৃহীত

তবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বাকিরা এত ভদ্র থাকেননি। গসিপের বাজারে বিষ ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ কেউ ছবির নাম বিকৃত করে বলল ‘ছোলে’, আবার কেউ বিদ্রূপ করে বলল ‘তিন মহারথী আর এক চুহা’র ছবি। অনেকে বললেন, এ ছবির সবকিছুই ভুলে ভরা, এত রক্তপাত দেখতে কেন মানুষ পরিবার নিয়ে হলে আসবে? জয়-বীরুর ‘দোস্তি’কে  অত্যন্ত খারাপ স্বাদের বলে উপহাস করা হল। গব্বরকে ছবিতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, গলার জোরও নেই বলে বিদ্রুপ করা হল। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তো বলেই বসলেন- ‘হিন্দুস্থানিদের এমন ছবি দেখতে ভালো লাগে না।’

গ্রাফিক্স- সিবুলেটিন.কম

সমালোচকেরাও সহমত জানালেন। ‘শোলে’ ছবির শিরোনাম ঘুরিয়ে একজন লিখলেন, ‘নিভে যাওয়া অঙ্গার’। আর একজন মন্তব্য করলেন,—“সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, পাশ্চাত্যকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে বসানোর ব্যর্থ চেষ্টা’। ব্যবসায়িক পত্রিকাগুলিও মুখ গোমড়া করে বসে থাকল। বিপর্যয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল ৩ কোটির ছবি। ফাঁকা হলঘর, খারাপ পরিসংখ্যান, কঠোর সমালোচনা নিয়ে নড়েচড়ে বসল সিপ্পি ফিল্মস।  

গ্রাফিক্স- সিবুলেটিন.কম

বিশৃঙ্খলার মধ্যে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবলেন রমেশ সিপ্পি। জয়ের মৃত্যু, ঠাকুরের নির্মম প্রতিশোধ, গব্বরের নিষ্ঠুরতার মত দৃশ্যকে পুনরায় চিত্রায়িত করার কথা ভাবলেন তিনি। প্রস্তুত ছিল সবাই। সমালোচনা আর ব্যর্থতার ধাক্কায় সবাই ক্লান্ত ছিল। কিন্তু আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন রমেশ সিপ্পি। প্রিমিয়ার সপ্তাহ শেষ হতে যাচ্ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেও সেলিম-জাভেদ সায় দিলেন না। কঠোর হয়ে ‘শোলে’র প্রতি বিশ্বাসে অটুট হয়ে থাকলেন- ‘শোলে’ বিফলে যেতে পারে না। ছবির গল্প, চরিত্রগুলি এবং সংলাপের জন্য বাজি ধরতে রাজি ছিলেন তাঁরা। 

ছবি- সংগৃহীত

এরপর ঘটল বিরাট ‘বিস্ফোরণ’। দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বম্বের অলিতে গলিতে ‘শোলে’ ছড়িয়ে পড়ল। থিয়েটারে দর্শকের আসন ভরে উঠল। সংলাপ ছড়াতে শুরু করল মুখে মুখে- ‘ইয়ে দোস্তি’, ‘এক এক কো চুন চুন কে মারুঙ্গা’, ‘ইসকি সাজা মিলেগি, বরাবর মিলেগি’, ‘জো ডর গয়া, সমঝো মর গয়া’, বাসন্তি, ইন কুত্তো কে সমনে মত নচনা’। দর্শক ফিরল, টিকিট–জানালায় লাইন বাড়ল, কালোবাজারি চালু হল, তারপর ধীরে ধীরে সেই সব কালজয়ী সংলাপ ভারতের শিরা উপশিরায় মিশে গেল। ‘ফ্লপ’-এর গালগল্প উল্টে গেল ‘অল–টাইম ব্লকবাস্টার’-এ।  মিনার্ভায় ‘শোলে’ টানা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলল।

ছবি- সংগৃহীত

কিংবদন্তী ‘শোলে’ ছবির চিত্রনাট্যে লুকিয়ে ছিল এই ছবির  প্রাণভোমরা। স্রষ্টারা ছিলেন সেলিম-জাভেদ। ছবির চিত্রনাট্য প্রথমে উর্দু লিপিতে লেখা হয়েছিল। পরে তা হিন্দি দেবনাগরী ভাষায় অনুবাদ করা হয়। পশ্চিমা স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্ন, সামুরাই সিনেমা এবং এদেশীয় ডাকাতিয়া সিনেমাগুলির রীতিগুলি একসুতোয় বেঁধে সৃষ্টি করা হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘রামগড়’-এর কাহিনী। রমেশ সিপ্পির সিনেম্যাটিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নৈতিক দ্বন্দ্ব, গ্রামীণ সামন্ততন্ত্রের ক্ষমতা, প্রতিশোধ, রোম্যান্স, আর নির্ভেজাল হাস্যরসের মসলার মিশ্রণে তা হয়ে উঠেছিল বলিউডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য।

ছবি- ইনস্টাগ্রাম

ব্যাঙ্গালোরের অদূরে কর্নাটকের রামনগরের বিস্তীর্ণ পাথুরে ভূমি খোদাই করে গড়ে উঠেছিল শোলে ছবির কাল্পনিক গ্রাম ‘রামগড়’। বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন, শুনশান এই অঞ্চলকে এক ক্ষুদ্র, ধুলো-উড়ানো জগতে রূপ দিতে ঢালাও অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছিল। পাথুরে টিলা, গভীর গিরিখাত আর আকাশে ভাসমান তুলোর মতো মেঘ—সব মিলিয়ে শোলের প্রাকৃতিক দৃশ্যপটকে গাম্ভীর্যে ভরিয়ে তুলেছিল। আর্ট ডিরেক্টর রাম ইয়েদেকর রামনগরকে অসাধারণ এক বিস্তৃত সেটে রূপান্তরিত করেন। অন্যদিকে, বোম্বে–পুনে রেলপথের পনভেলের কাছে শুট হয়েছিল ট্রেন-ডাকাতির রুদ্ধশ্বাস দৃশ্য, যা ছবির অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে ওঠে।

ছবি- সংগৃহীত

আর্ট ডিরেক্টর রাম ইয়েদেকর শোলের জন্য রামনগরকে অসাধারণ এক বিস্তৃত সেটে রূপান্তরিত করেছিলেন। ব্যাঙ্গালোরের অদূরে কর্নাটকের রামনগরের পাথুরে ভূমিকে খোদাই করে রামগড়কে তৈরি করা হয়েছিল, যা আজও ‘সিপ্পি নগর’ বা ‘শোলে রকস’ নামে পরিচিত। বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন, শুনশান, ঘোড়ার ক্ষুরের ঘর্ষণে ধুলো ওড়া রামনগরের রাস্তা ছবির দৃশ্যকে যেন জীবন্ত করে তুলেছিল। ডাকাত গব্বরের গর্জনে কেঁপে উঠেছিল জনমানবহীন পাথুরে টিলা এবং গিরিখাত। ট্রেন-ডাকাতির রুদ্ধশ্বাস দৃশ্যটি নেওয়া হয়েছিল।বোম্বে-পুনে রেলপথের পনভেলের কাছে।

ছবি- সংগৃহীত

‘শোলে’ ভারতীয় মেইনস্ট্রিমে ৭০ মিমি প্রজেকশন আর ছয়–ট্র্যাক স্টেরিওফোনিক সাউন্ডকে বড় পরিসরে নিয়ে এসেছিল। এমনকি পোস্টারে পর্যন্ত ‘৭০মিমি’-র দাপট দেখা যেত। সিপ্পি প্রশস্ত পর্দার সঙ্গে শব্দের বিস্তারকে যুক্ত করে দর্শকদের নতুন অভিজ্ঞতা দিতে চেয়েছিলেন। যদিও বাজেটের দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত ৩৫মিমি ফিল্মেই ছবির শ্যুট হয়েছিল। পরে তা ২ :২:১ ফ্রেমে রুপান্তরিত করা হয়।  সিনেমাটোগ্রাফার দ্বারকা দিবেচার ফ্রেমিং, রেকর্ডিং–রিমিক্সিংয়ে মঙ্গেশ দেশাইদের কাজ ছবির অ্যাটিটিউড পাল্টে দিয়েছিল।

ছবি- সংগৃহীত

‘শোলে’ আজ আর শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি একটি অনুভূতি। যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে এসেছে। নায়ক-খলনায়কের দ্বন্দ্ব, বন্ধুতের বিরলতম গল্প, প্রেমের টানাপোড়েন, অবিস্মরণীয় ডায়লগ, আর ডি বর্মণের ‘মেহবুবা ও মেহবুবা’ মানুষের দেনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। ‘শোলে’ জলজ্যান্ত মানুষের মতনই হার-জিতের উপাখ্যান। যা ইতিহাস হয়েও রূপ বদলে ফিরে আসে প্রত্যেকের জীবনে।  

ছবি- সংগৃহীত

ভারতের সর্বকালের সেরা ছবিগুলির মধ্যে অন্যতম ‘শোলে’। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ২০০২ সালে সেরা দশটি ভারতীয় চলচিত্রের মধ্যে একে স্থান দিয়েছিল। ২০০৫ সালে ৫০তম ফিল্ম ফেয়ার অনুষ্ঠানে এই ছবি বিশেষ ‘বেস্ট ফিল্ম অব ৫০ ইয়ার্স’ সম্মান পেয়েছিল। দেশ-বিদেশে বহুবার বহুজায়গায় ‘শোলে’ প্রদর্শিত হয়েছে। সেই সঙ্গে কুড়িয়েছে সন্মান আর দর্শকদের ভালবাসা। শোলে আসলে শেষ না হওয়া একটি সময়। যার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনে আমরা সবাই বিরাজ করছি।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, শোলে দ্য মেকিং অফ এ ক্লাসিক- অনুপমা চোপড়া