আজ ২২শে শ্রাবণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবস। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে দিনটি ছিল ৭ আগস্ট, ১৯৪১ সাল।
৮৪ বছর আগে শ্রাবণ মাসের এমনই একটি বর্ষণমুখর দিনে কবিগুরু চিরবিদায় নিয়েছিলেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির আঙ্গিনা থেকে ‘একখানি ফুলের নৌকা’ চড়ে অমৃতধামের পথে হারিয়ে গিয়েছিলেন। সেই দিনটি ভোলার নয়।
১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই কবি খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। অসুখে ভুগে যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীর আর যেন পেরে উঠছিল না। কোনোক্রমে অতিবাহিত হচ্ছিল প্রতিটি দিন। দিন যে আসন্ন তা তিনি বুঝতে পারছিলেন। তবু কষ্টের মাঝে হাসির সুরে কথা বলছিলেন তিনি।
সারা জীবন তিনি নিজের দেহে ডাক্তারকে কাটাকুটি করতে দেননি। অপারেশনে তার আগাগোড়াই ঘোরতর আপত্তি ছিল। বলতেন, ‘মানুষকে তো মরতে হবেই একদিন। এক ভাবে না এক ভাবে এই শরীরের শেষ হতে হবে তো, তা এমনি করেই হোক না শেষ। ক্ষতি কি তাতে? মিথ্যে এটাকে কাটাকুটি ছেঁড়াছিঁড়ি করার কি প্রয়োজন?…তার দেওয়া দেহ অক্ষত ভাবেই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া ভালো’।
অদ্ভুত মনের জোরে রোগগ্রস্ত শরীরকে সামাল দিতেন তিনি। ‘তাঁর নিজের মনের ওপর আশ্চর্য রকমের অধিকার ছিল’। কতবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কিন্তু রোগকে রেয়াত করেননি। তিনি বলতেন, ‘শারীরিক কষ্ট আমি পাইনে মোটেই। একবার আমায় বিছে কামড়েছিল- সে কি যন্ত্রণা! হঠাৎ আমার মনে হল- এ তো আমি কষ্ট পাচ্ছি নে, রবীন্দ্রনাথ বলে একজন কবি আছে তাকে বিছিয়ে কামড়েছে। এই বলে আমিই আমাকে আলাদা করে দেখতে লাগলুম। চট করে আমার যন্ত্রণা কোথায় গেল- সব ভুলে গেলুম। মনে একটা আনন্দ হল যে, এমনি একটা উপায় থাকতে লোকে কেন কষ্ট পায়। এই উপায়টি আমার আগে জানা ছিল না। সেই অবধি আমার শারীরিক কষ্ট হলে যে-আমি কষ্ট পাচ্ছি তাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে দেখি, কাছে আসতে দিই না।’
১৯৩৭ সালের শেষ দিকে কবির শরীর গুরুতর অসুস্থ হতে শুরু করে। কিডনির সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। তবে সে যাত্রা তিনি সেরে ওঠেন।
১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বরে রবীন্দ্রনাথ কালিম্পং গেলেন পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর কাছে। দিন সাতেক সেখানে থাকার পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। রক্ত পরীক্ষায় দেখা গেল তাঁর প্রস্টেট গ্লান্ডে সমস্যা। প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ ডাক্তার নিয়ে ছুটলেন কালিম্পঙে। সাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘দার্জিলিংয়ের সিভিল সার্জন বলেছিলেন তখনই অপারেশন না করলে কবিকে বাঁচানো যাবে না। প্রতিমা দেবী এবং মৈত্রেয়ী দেবী তখনই অপারেশন না করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন’।
অসুস্থ অবস্থাতেই কবিকে কলকাতায় নিয়ে আসা হল। তখনও তিনি অজ্ঞান। রানী চন্দ লিখছেন, ‘খবর পেয়ে জোড়াসাঁকোয় চলে এলাম। যে গুরুদেবকে কতবার কত অসুস্থতায়ও বিছানায় শুয়ে পড়তে দেখি নি- ইজি চেয়ারে এলিয়ে বসতেন- ওই পর্যন্ত। সেই গুরুদেবকে যখন স্ট্রেচারে করে গাড়ি হতে নামানো হল দেখে বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠলো। জোড়াসাঁকর দোতালায় পাথরের ঘরে তাঁকে এনে তোলা হলো’। প্রায় এক মাস চিকিৎসার পর একটু সুস্থ বোধ হলে ফিরে গেলেন শান্তিনিকেতনে। শান্তিনিকেতনে তাঁর ঠাই হল উদয়নে। তার দিনকয়েক পরে আরও একটু সুস্থ হলে জাপানীঘরে।
রানী চন্দ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের খুব স্নেহের আশ্রমকন্যা। ছবি আঁকা, লেখায় তাঁর ভালো হাত ছিল। তিনি চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসুর ছাত্রী। শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর পাশে থেকে রানী চন্দ তাঁর দেখভাল করতেন। তাঁর আরও একটা পরিচয় ছিল। তিনি রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সচিব অনিল চন্দ্রের সহদর।
কবির অসুস্থতার সময় অবন ঠাকুর (অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর) কবিকে দেখতে এসে যা যা বলতেন রানী চন্দ তা লিখে রাখতেন। সেগুলি এসে আবার কবিকে শোনাতেন। কবি খুব খুশি হতেন। অনেকসময় চোখ জলে ভরে উঠত। তিনি চাইতেন অবন আরও বলুক, আর রানী লিখুক। রানীকে বলতেন, ‘অবনকে গিয়ে আমার নাম করে বলিস, আমি শুনতে চেয়েছি।’
এরই মধ্যে রবীন্দ্রনাথ পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রস্টেটের সমস্যা বিপদের কারণ হয়ে উঠল। হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি কোনো কিছুতেই কাজ হল না। ডা. বিধানচন্দ্র রায়, ডা. ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ডা. ইন্দুভূষণ বসু শান্তিনিকেতনে গিয়ে কবিকে অনেক করে বোঝালেন। অবশেষে, ইচ্ছা না থাকলেও অস্ত্রোপচার করতে রাজি হলেন কবি।
অস্ত্রোপচার করার জন্য কবিকে শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতায় আসতে হল। ২৫ জুলাই ১৯৪১ সাল। শান্তিনিকেতনের মাটিতে ছিল ‘তার শেষ স্পর্শ’। আশ্রমের সকলে মিলে তাঁকে বিদায় জানালো। অসুস্থ কবিকে বোলপুর স্টেশন থেকে ট্রেনে চাপিয়ে কলকাতায় আনা হল। কলকাতায় কবির আসার খবর গোপনই রাখা হয়েছিল, যাতে তিনি নিরিবিলিতে আসতে পারেন।
২৫ জুলাই বিকেল তিনটে পনেরো মিনিটে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে এসে উঠলেন। দোতালার সেই পাথরের ঘরে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হল। অপারেশন হবে বলে এই ঘর থেকে সমস্ত কিছু আগে থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এমনকি ঘরের দুদিকের দেয়ালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ও প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের বড় বড় দুটি ছবিও সরানো হয়েছিল। ঐদিন বিকেলে তিনি তেমন কথাবার্তা বলতে পারেন নি। রাতের দিকে শুধু একবার বলেছিলেন, ‘কি জানি ভালো লাগছে না যেন আমার।’
২৬ জুলাই সকালে খুব উতফুল্ল ছিলেন কবি। ক্লান্তি অনেকটা কেটে গিয়েছিল। রাতে ঘুমও ভালো হয়েছিল। ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ এলে তাঁর সঙ্গে বসে অতীত দিনের কথা স্মরণ করে অনেকক্ষণ গল্প করলেন। হাসি খুশিতে মজে উঠলেন ৮০ বছরের খুড়োর সঙ্গে ৭০ বছরের ভাইপো। দুপুরের দিকেও গুরুদেব ভালই ছিলেন। বিকেল সাড়ে চারটার সময় কবির ডান হাতের শিরায় ৫০সিসি গ্লুকোজ ইনজেকশন দেওয়া হল। গুরুদেব ব্যথা পেয়েছিলেন। বললেন ‘ দ্বিতীয়া গেল সব জ্বলিয়া।’
ইনজেকশন দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কবির সারা শরীর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল। প্রায় .৩০ মিনিটের ওপর ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন তিনি। কম্বল চাপা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন সারারাত। সারারাত এভাবেই ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি।
২৭ জুলাই সকালে উঠে গুরুদেব মুখে মুখে ‘প্রথম দিনের সূর্য’ কবিতাটি বললেন। খাতা পেন নিয়ে লাইনগুলি লিখলেন রানী চন্দ। এরপর রানীর হাত থেকে খাতাটা নিয়ে কবি শুয়ে শুয়েই বুকের উপরে কাগজটি ধরে নিজের হাতে কিছু লাইন সংশোধন করলেন। রানী চন্দের মুখে ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা’ কবিতাটিও শুনলেন। মাঝে আবার রসিকতা করে বললেন ‘ডাক্তাররা বড় বিপদে পড়েছে। কত ভাবে রক্ত নিচ্ছে, পরীক্ষা করছে; কিন্তু কোন দোষই পাচ্ছে না তাতে। এ তো বড় বিপদ হল হে ডাক্তারদের। রোগী আছে, রোগ নেই।’
২৯ জুলাই সকালে গুরুদেব অপারেশনের চিন্তায় খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। বললেন, ‘যখন অপারেশন করতেই হবে তখন তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা চুকে গেলেই ভালো।’ পরের দিন ৩০ জুলাই কবির অপারেশনের দিন ধার্য করা হয়েছিল। কবিকে জানতে দেওয়া হয়নি। ‘পাছে গুরুদেব কোনরকম বিচলিত হয়ে পড়েন।’
৩০ জুলাই কবির অপারেশন হল। জোড়াসাঁখোর ঠাকুরবাড়ির দোতলার পাথরের ঘরের পূব দিকের লম্বা বারান্দার দক্ষিণ দিকে অপারেশনের টেবিল সাজানো হয়েছিল। গুরুদেব টেরও পাননি। বেলা 11 টার সময় কবিকে অপারেশন টেবিলে নিয়ে আসা হল। দেওয়া হল লোকাল এ্যানাস্তেসিয়া। বেলা 11:20 সময় অপারেশন শুরু হয়ে সেলাই ব্যান্ডেজ ইত্যাদি করতে করতে প্রায় আধঘন্টা লাগল। ঐদিন কবির গায়ের তাপ অন্যদিনের তুলনায় কমই ছিল। রাতের দিকে কবির ঘুম ভালোই ঘুমোলেন।
৩১ জুলাই কবি তেমন কথা বলতে পারলেন না। গায়ে তাপ বেড়েছিল। যা দুই একটা কথা বলছিলেন তা হল শুধু – ‘ব্যথা করছে, জ্বালা করছে।’ দুপুরের পর থেকে কেমন যেন নিঃসাড় হয়ে গেলেন। রাতেও ঘুম ভালো হল না।
১ আগস্ট, কবি আর কথা বলতে পারলেন না। অসাড় হয়ে থাকলেন। অল্প অল্প জল আর ফলের রস খাওয়ানো হচ্ছিল। ডাক্তাররাও চিন্তায় পড়ে গেলেন।
২ আগস্ট সকালটা ভালোই কাটল। কিছু কথা বললেন। দুপুরের পর থেকে আবার মুষড়ে পড়লেন। মাঝে মাঝে কাশি আর হিক্কা উঠছিল। বিকালে কবিকে দেখতে ডক্টর বিধানচন্দ্র রায় এসেছিলেন।
৩ আগস্ট সকালে কবি যেন একটু ভালই ছিলেন। ফোন করে শান্তিনিকেতনে থেকে প্রতিমা দেবীকে জোড়াসাঁকোতে আসতে বলা হল। দুপুরের পর থেকে আবার তিনি আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন। রাতটা একদমই ভালো কাটল না।
৪ আগস্ট ভোরবেলা কবি দু-একটা কথা বলতে পারলেন। ডাকলে সাড়াও দিলেন। তবে তার বেশি নয়। ফিডিং কাপে করে চার আউন্ডসের মতো কফি খেলেন। রাতে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেল।
৫ আগস্ট ডাক্তার ললিত বন্দ্যোপাধ্যায় কবিগুরুর অপারেশনের একটি সেলাই খুললেন। সন্ধ্যার দিকে স্যার নীলরতন সরকার সঙ্গে নিয়ে বিধানচন্দ্র রায় এলেন কবিকে দেখতে। অবস্থার অবনতি ঘটছিল। রাতের দিকে স্যালাইন দিতে হল কবিকে। অক্সিজেনও এনে রাখা হয়েছিল। গাল দুটো ফুলে কেমন গিয়েছিল। বাঁদিকে নাকটা একটু হেলে ছিল। লাল হয়ে আসছিল বাম চোখ।
৬ ই আগস্ট সকাল থেকেই বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। সমানে হিক্কা উঠছিল কবির। মাঝে খুব জোরে একবার কেশে উঠলেন। রাত বারোটার সময় গুরুদেবের অবস্থা আরও সংকটময় হয়ে উঠল। জানালার বাইরে দিয়ে সেদিন শ্রাবণ পূর্ণিমার ভরা চাঁদ উঠেছিল।
২২শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ
ভোর থেকেই জোড়াসাঁকোর বাড়ির সরু গলিতে মোটর গাড়ির আনাগোনা শুরু হয়েছিল। সবাই আসছেন কবিকে দেখতে। বেলা নটার দিকে অক্সিজেন দেওয়া শুরু হল। নিঃশ্বাসে ক্ষীণ শব্দ। সেই শব্দ ধীরে ধীরে আরো ক্ষীণ হয়ে এলো। পায়ের তাপ কমে আসছিল। বাইরে বাড়ছিল জনতার কোলাহল। মনে হচ্ছিল এই সময় গড়িয়ে এল। বারোটা বাজতে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটল। নিঃশ্বাস থেমে আসছিল বারে বারে। তারপর যখন বারোটা দশ বাজল, একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল কবিগুরুর নিঃশ্বাস। মায়ার বাঁধন ছেড়ে কবি চলে গেলেন অমৃতের সন্ধানে।
লোকে লোকারণ্য তখন ঠাকুরবাড়ি। বেনারসি-জোড় পরিয়ে দেওয়া হল কবিকে। কোচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি, পাট করা চাদর, কপালে চন্দন, গলায় মালা, দেহের দুপাশে রজনীগন্ধা দিয়ে সাজানো হলো। দেখে মনে হচ্ছিল ‘যেন রাজবেশে রাজা ঘুমোচ্ছেন রাজশয্যার উপরে’।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চললেন আমাদের ছেড়ে। রেখে গেলেন অন্তহীন সম্পদ। যে সম্পদ অফুরন্ত আস্বাদন করলেও ফুরাবার নয়। ২২শে শ্রাবণ তাঁর মহাপ্রয়াণ দিবসে কবির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।