ছোট গল্প
কয়েকদিন অনেক ইতিহাস পাতিহাস ঘেঁটে যা জানলাম, তা খুবই অদ্ভুত। এক্সরে যে শরীরের পক্ষে খারাপ তা সবাই জানে। কিন্তু সে যে মনের ওপরেও এমন প্রভাব ফেলতে পারে, আমার ধারণার বাইরে ছিল।
কানপুরে বর্ন এন্ড ব্রট-আপ রশ্মি। ছোট থেকেই খুব এমবিষাস। বাবা ওকে প্রতি মুহূর্তে সাপোর্ট করতেন। নানান রকম বই পত্তর এনে দেয়া থেকে শুরু করে কম্পিটিটিভ পরীক্ষার জন্য তৈরি করা, সব বাবার অবদান।
মা ছিলেন ঘোর ছাপোষা বাঙালি। যে মেয়ে এখনো নিজের থালায় ভাত বেড়ে নেয়া শিখলো না, সে শশুরবাড়ি গিয়ে রান্না করতে পারবে কিনা সেই নিয়ে টেনশন করে তিনি বদহজমে ভুগতেন আর রোজ সকালে জলমুড়ি খেতেন।
আদর্শ জামাই বলতে যে তাঁর কাছে সরকারি স্কুলে বা ব্যাংকে দশটা-পাঁচটার চাকরি করা, হুইস্কি-বিয়ার হীন, বাঁদিকে সিঁথে কাটা গোপাল-গোছের বাঙালি ভদ্রলোক – সে কথা রশ্মির বাবাকে প্রতিদিন ভোরে ওম-জবাকুসুম বলার মতো একবার স্মরণ করিয়ে দিতেন।
মায়ের টেনশন প্রায় আড়াইগুন বেড়ে গেল, যখন মেয়ে বাইশে পা দিল। একটাও ভালো সম্বন্ধ জোগাড় করতে পারেননি। মালদায় বড়ো ভাইয়ের কাকিশাশুড়ি, কালীঘাটে পিসির ননদ, সব্বাইকে অনুরোধ জানিয়েছেন, একটা ভালো ছেলে খুঁজতে। কেউ নাকি খুঁজেই পায়না। আসলে আত্মীয় স্বজনরা ভালো থাকুক এমন আজকাল কেউ চায় না, ঈর্ষায় জ্বলে। এদিকে মেয়ে ইউ এস এ স্কলারশিপ পেয়ে হায়ার স্টাডি করবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। কি যে হবে কে জানে!
এরকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই সেবার ট্রেন এ তেরো ঘন্টা কেটে গেল। শিয়ালদা স্টেশনে নামার সময় কুলি পাওয়া যাচ্ছিল না। একটি ছাব্বিশ-সাতাশ এর ছেলে খুব হেল্প করলো। কথায় কথায় আলাপ হলো, রঞ্জন রায়। ব্যাংকের পরীক্ষা দিয়ে পাটনা থেকে ফিরছে। তেমন ভালো হয়নি- তবে সে এস এস সি ক্লিয়ার করেছে। স্কুলের চাকরিটা নিশ্চিত।
রশ্মির মা ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে ভুললেন না। অবাক কান্ড দেখো, ভগবানের ইচ্ছা থাকলে যা হয় আর কি – ছেলেটির বাড়ি দমদম নাগেরবাজার- আর দুটো গলির পরেই রশ্মির দাদুর বাড়ি, যেখানে সেদিনই সন্ধেবেলা রশ্মির জন্মদিন উপলক্ষে ভুরিভোজের আয়োজন হচ্ছে। অতঃপর একই ট্যাক্সিতে গন্তব্যে পৌঁছানো, ফোন নম্বর বিনিময়, সন্ধের আমন্ত্রণ ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে মায়ের চিন্তার পারা প্রায় পঁচিশ শতাংশ নেমে এলো।
রশ্মির মনে যদিও একটু দ্বন্দ্ব শুরু হলো। সরি ফর দিস ভাবনা, তবে, মায়ের এমন আদিখ্যেতা সে কখনো দেখে নি। মা আবার এই ঝিঙেটার সাথে বিয়ের কথা ভাবছে না তো! যাই হোক, দুপুরে দিদার হাতে মাটন কষা খেয়ে ওসব ভাবনা কান দিয়ে বেরিয়ে গেল।
এর পরবর্তী কয়েক বছরের কথা ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়নি। শোনা যায়, রশ্মির মা একরকম জোর করেই তাকে ছেলেটির সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসায়। কিন্তু রশ্মির জেদের কাছে সে সম্পর্ক টেকে নি। রাগারাগি করে অবশেষে মিউচুয়াল ডিভোর্স নিয়ে সে আমেরিকাতে পড়তে চলে যায়।
কিন্তু এর পরবর্তী ঘটনা আজও লোকের মুখে মুখে ঘোরে। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি তে নতুন সেমিস্টার শুরু হতেই রশ্মিকে খবর দিলো বেস্ট ফ্রেন্ড ডেভিড – ইন্ডিয়া থেকে নতুন প্রফেসর আসছে ডেটা সায়েন্স পড়াতে। নামটা শুনে রশ্মি একটু হতভম্ব হলো- রণজান রে। কিন্তু সেই লোকটা এখানে কি করে আসবে। জীবনের গল্পটা কেমন পুরোনো বাংলা সিনেমার মতো হয়ে যাচ্ছে না?
ক্লাস শুরু হলো। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না রশ্মি। অবিকল সেই লোকটা। কিন্তু কি গ্ল্যামার। কি ভয়েস! দামি চশমার ফাক দিয়ে চেনা চোখদুটো কেমন সম্পূর্ণ অচেনা লাগছে।
অস্বস্তি তে উঠে বেরিয়ে যাচ্ছিল রশ্মি। প্রফেসর রে ধমক দিয়ে বসতে বললেন – এটা ক্লাস, নিজের বাড়ি নয়, মন চাইলেই উঠে চলে যাওয়া যায় না।
এমন বকা খাওয়ার অভ্যেসটা কেটে গেছিলো রশ্মির। আর এমন বকা দেবার রেওয়াজও বিদেশে নেই। অবাক হয়ে অনেকে জিজ্ঞেস করলো, তোর চেনা? রশ্মি অস্ফুটে বললো, মাই এক্স।
সেদিন থেকে প্রফেসর রে হয়ে গেলেন এক্স-রে।
বিস্ময়, গ্লানি, তিক্ততা, ভালোলাগা, গর্ব, সব মিলিয়ে রশ্মির মন উথাল পাথাল হতে থাকে। পড়ায় মন বসছে না বলে বিরক্ত হয়ে একদিন রঞ্জনকে বলেই বসলো, কেন এসেছেন এখানে।
তবে কথাটা যে অবান্তর সেটা সে নিজেই বুঝেছিল। প্রফেসর মজা করে বললেন, দেখতে এলাম, তুমি ঠিক করে পড়াশোনা করছো কিনা।
ধীরে ধীরে একটা পূর্ণতা ফিরে পাচ্ছিল রশ্মি। বিদেশি বন্ধুদের সাথে যে হৃদয়ের টানটুকুর অভাব ছিল, স্বদেশের এক অতীত তাকে তা পূরণ করতে লাগলো। ক্লাস, লাইব্রেরীর সাথে শুরু হলো একসাথে ব্রিজের ওপর হাঁটা, নদীর কলকল শোনা, নীল আকাশের নিচে সবুজ ঘাসে বসে ফড়িং ধরা।
ফেলোশিপ শেষ। প্রফেসর এক্সরে ফিরবেন দেশে। স্টুডেন্টদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে ফেরার পথে সামনে দাঁড়ালো রশ্মি। আর কটা দিন থাকলে পারতে। একসাথেই ফিরতাম। লাস্ট সেমিস্টারের আর তো মোটে কটা দিন।
বলাই বাহুল্য, ফেরার ইচ্ছে প্রফেসরএরও ছিল না। রশ্মির হাত ধরে নায়াগ্রা দেখতে দেখতে অতীতটা কেমন ঝাপসা বাষ্পে মিলিয়ে গেছিলো। তাই উল্টো পথে ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছিল না।
দেরি হবে শুনে বাড়িতে বাবা মায়েরা বরং খুশিই হয়েছিলেন। এক্স-রে নয়, রঞ্জন-রশ্মি ফিরছে বাড়িতে।
।সমাপ্ত।