বিগত কয়েক দিন ধরে ‘জিবলি’তে মজেছে নেট দুনিয়া। সোশ্যাল মিডিয়ার সাইটে ভরে গেছে মজার মজার কার্টুন ছবিতে। জানা, অজানা মানুষের কার্টুন ছবিতে সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে উঠেছে জমজমাট। সচিন থেকে লিওনেল মেসি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রত্যেকেই নিজের ‘কার্টুন ছবি’ পোস্ট করেছেন সমাজ মাধ্যমে। চ্যাট জিপিটি- র মাধ্যমে নিমেষে তৈরি করা যাচ্ছে প্রখ্যাত জিবলি আর্টের আদলে নিজের বা আপনজনের ছবি।
কিন্তু কি এই জিবলি আর্ট? কিভাবেই বা এল এই অদ্ভুত শিল্পের নাম? আসুন জেনে নিই এই শিল্পের গোড়ার কথা।

জিবলি আর্টের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। এটি আসলে একটি জাপানি অ্যানিমেশন স্টুডিও। ১৯৮৫ সালের ১৫ই জুন টোকিওর কোগেনেই অঞ্চলে প্রথম যাত্রা শুরু করে এই স্টুডিও। চার প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে চলচ্চিত্রকার ও অ্যানিমেশন শিল্পী হায়াও মিয়াজাকি অন্যতম। তিনি এই জিবলি নামটি বেছে নেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত ইতালীয় এক উড়োজাহাজের নাম থেকে। সাহারা মরুভূমিতে ইতিলির নজরদারি বিমান ছিল ক্যাপ্রোনি কা ৩০৯, যার আবার অন্য নাম ছিল জিবলি। মিয়াজাকি এই নামটিই নিজের অ্যানিম স্টুডিওর জন্য বেছে নেন। কেননা উড়োজাহাজ ছিল মিয়াজাকির খুব পছন্দের বিষয়।
জাপানের জিবলি স্টুডিও মূলত অ্যানিমে ফিচার চলচিত্রের জন্য বিখ্যাত। অ্যানিমেটেড ফিল্ম ছাড়াও এই স্টুডিওটি কয়েকটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের টেলিভিশন ফিল্ম ও বিজ্ঞাপনও তৈরি করেছে। জিবলি চলচ্চিত্রগুলোর বিশেষত্ব এটাই যে জলরং অথবা অ্যাক্রিলিক রং দিয়েই ফ্রেম বাই ফ্রেম আঁকা হয় সমস্ত অ্যানিমেশন। শিল্পীদের হাতে আঁকা উজ্জ্বল ছবিগুলো পরপর সাজিয়ে তৈরি হয় চলমান চিত্র।

জিবলির জনপ্রিয়তা কতখানি তার একটি খতিয়ান দিলেই বোঝা যাবে। গত ৩৮ বছরে হাতে গোনা মাত্র বাইশটি ছবি তৈরি করেছে এই স্টুডিও। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও এই ২২ টা ছবির সবগুলোই শুধু জাপান নয়, সারা বিশ্বের অ্যানিমেশন জগতে দর্শকদের মন জয় করেছে। জিবলির কাছে ওয়াল্ট ডিজনির অংশীদারির প্রস্তাব আসে। বিশ্বের দরবারে পৌঁছোয় জিবলির অ্যানিমেশন।
জিবলি স্টুডিওর তৈরি করা অ্যানিমেশনগুলির খ্যাতি জগৎজোড়া। গ্রেভ অফ দ্য ফায়ারফ্লাইজ (১৯৮৮), স্পিরিটেড অ্যাওয়ে (২০০১), হুইস্পার অব দ্য হার্ট (১৯৯৫), ওসিয়ান ওয়েভস (১৯৯৩) এর মতন ছবি গুলোর খ্যাতি কারোর অজানা নয়। জিবলির ছবিগুলি বাফটা, গোল্ডেন গ্লোব, অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড (অস্কার) প্রভৃতি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে একাধিকবার। ২০০৩ সালে ৭৫ তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’ ছবিটি প্রথম হাতে আঁকা ও অ–ইংরেজি ভাষার এ্যানিমেটেড ছবি হিসাবে অস্কার জেতে। ২০০২ সালে ছবিটি গোল্ডেন বিয়র পুরস্কারও যেতে। ‘দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরণ’ ছবিটি ২০২৪ সালে গোল্ডেন গ্লোব পুরষ্কার, বাফটা ও অস্কার জেতে। ওই বছর মিয়াজাকি প্রতিষ্ঠিত স্টুডিও জিবলিকে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘পালমে ডি অর’ পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। আসলে পুরষ্কার ও সম্মানের তালিকা এত লম্বা যে এখানে বলে হয়তো শেষ করা যাবে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মেশিনে নিমেষের মধ্যেই জিবলি ছবি তৈরি হলেও, সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে শিল্পীদের হাতে তৈরি হওয়া সেইসব কালজয়ী অ্যানিমেশন গুলির জনপ্রিয়তা ও আকর্ষণ যে আজও অমলিন, সে কথা তো একবাক্যে স্বীকার করতেই হবে।