যুগ যুগ ধরে অনন্ত শূন্য এই মহাকাশ মানুষের সীমাহীন কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। পৃথিবীর বাইরে মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা নিরন্তর গবেষণা করে চলেছেন। তবে, সম্প্রতি সৌরজগতের বাইরের কোনো গ্রহে সম্ভাব্য প্রাণের অস্তিত্বের শক্তিশালী প্রমাণ হাতে এসেছে বলে দাবি করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যন্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NASA)-র টেলিস্কোপে এমন সম্ভাব্য প্রাণের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা K2-18b নামক একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ভিত্তিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ অণুর সন্ধান পেয়েছেন – যেমন, মিথেন (Methane) এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2) গ্যাস।
এই K2-18b গ্রহটি আমাদের সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহ, যেটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১২০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।। এটি একটি এক্সোপ্ল্যানেট বা বহির্গ্রহ। এর আয়তন পৃথিবীর তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি এবং ভর প্রায় নয় গুণ। এই গ্রহকে “সাব-নেপচুন” ক্যাটাগরির মধ্যে ধরা হয়, তার মানে, এটি নেপচুনের চেয়ে ছোট, কিন্তু পৃথিবীর চেয়ে বড়।

কিন্তু শুধু আকার নয়, এই গ্রহটির বায়ুমণ্ডলেই পাওয়া গেছে ডাইমিথাইল সালফাইড (DMS) এবং ডাইমিথাইল ডাইসালফাইড (DMDS) নামের রাসায়নিক। এই দুটি রাসায়নিক সাধারণত পৃথিবীতে জীবন্ত কোষ, বিশেষ করে সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাংকটনের মত কিছু জীবন্ত অণুজীব থেকে নির্গত হয়।
বিজ্ঞানীরা অবশ্য বলেছেন, এই আবিষ্কার পৃথিবীর বাইরে জীবন্ত প্রাণী আছে কিনা তার সরাসরি প্রমাণ নয়। বরং প্রাণ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু রাসায়নিক উপাদানের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে মাত্র, যা একটি জৈবিক প্রক্রিয়ার সংকেত হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য আরো পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন।
তবে বিজ্ঞানীরা এই আবিষ্কারের বিষয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোনমি ইনস্টিটিউটের অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট এবং ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’ এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক অধ্যাপক নিক্কু মধুসুদন বলেছেন, সৌরমণ্ডলের বাইরে এটিই প্রথম কোনো সম্ভাব্য বসবাসযোগ্য গ্রহ। জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী ডঃ নিক্কু মধুসূধনই হলেন এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার প্রধান কারিগর।
নাসা একথা পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছে, সব গ্রহেই প্রাণ ধারণের উপযুক্ত পরিবেশ থাকে না। আর এ কারণেই বিজ্ঞানীরা এমন “বাসযোগ্য গ্রহ” চিহ্নিত করার চেষ্টায় রয়েছেন—যেখানে পৃথিবীর মতো পরিবেশ থাকতে পারে।
এই খবরে বিজ্ঞানচেতি মানুষেরা যেমন রোমাঞ্চিত, তেমনই নতুন করে এক আশার আলো দেখছেন অনেকে। হয়তো ভবিষ্যতের কোনো এক দিন, আমরা সত্যিই জানতে পারব, আমরা এই মহাবিশ্বে একা নই।